ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত প্রেরণা, কোটি কোটি বিপ্লবীর ফাঁসির মঞ্চে বুক ফুলিয়ে গাওয়ার একমাত্র রণধ্বনি এবং আমাদের জাতীয় ভাবাবেগের পরম প্রতীক ‘বন্দে মাতরম’ গানটিকে এবার এক অনন্য ও সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষায় বাঁধতে চলেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার। আসন্ন বাদল অধিবেশনে মোদি সরকার সংসদে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ‘প্রিভেনশন অফ ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ পেশ করতে চলেছে। এই যুগান্তকারী সংশোধনী বিলটি আইনসভায় পাস হলেই ভারতের জাতীয় গীত ‘বন্দে মাতরম’-কে ইচ্ছাকৃতভাবে অবমাননা করা, কোনো প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে এই গান গাওয়ার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা বা এর প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা সরাসরি একটি বড় মাপের ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। আর এই গুরুতর অপরাধের জন্য দেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’-এর মতোই সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, বা মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের কড়া আইনি বিধান রাখা হয়েছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, গত মে মাসেই কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবে তাদের সবুজ সংকেত দিয়েছিল এবং আসন্ন ২০ জুলাই থেকে শুরু হতে চলা সংসদের বাদল অধিবেশনেই এই সংশোধনী বিলটি আলোচনা ও পাসের জন্য সগৌরবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত এই পবিত্র গানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও জাতীয়তাবাদে এর অবদান অপরিসীম। ১৯৩৭ সালে মহাত্মা গান্ধীর উপস্থিতিতে কংগ্রেসের অধিবেশনে এটিকে জাতীয় গীত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বন্দে মাতরম গানটি কেবল নির্দেশিকার আওতায় ছিল; এর অসম্মান রুখতে কোনো ‘আইনি দাঁত’ ছিল না। এই শূন্যতাকে দূর করে বন্দে মাতরম-কে জাতীয় সঙ্গীতের সমান মর্যাদা ও পূর্ণ আইনি কবচ দিতেই এই নয়া সংশোধনী আনছে মোদি সরকার। বর্তমানে ১৯৭১ সালের মূল আইনে শুধুমাত্র জাতীয় পতাকা, সংবিধান এবং জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননার বিরুদ্ধে শাস্তির আইনি বিধান রয়েছে, যার সাথে এবার সগৌরবে যুক্ত হতে চলেছে বন্দে মাতরম।
জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব এবং দেশের প্রতি গর্ববোধকে আরও মজবুত করতেই যে এই কঠোর পদক্ষেপ, তা বলাই বাহুল্য। এখন থেকে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো সরকারি বা বেসরকারি অনুষ্ঠানে বন্দে মাতরম গাওয়ার সময় হইচই করবেন, অবমাননাকর আচরণ করবেন কিংবা অসৌজন্যমূলকভাবে বসে থাকবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ সরাসরি ফৌজদারি মামলা রুজু করে গ্রেফতার করতে পারবে।
স্বভাবতই দেশের কোটি কোটি দেশপ্রেমিক নাগরিক কেন্দ্রের এই সময়োপযোগী ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তকে দু-হাত তুলে স্বাগত জানিয়েছেন। যদিও বিরোধীদের একাংশ এটিকে বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে সমালোচনা করার চেষ্টা করতে পারেন, তবে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, সাধারণ গঠনমূলক সমালোচনা বা সাধারণ মতপ্রকাশের অধিকার এতে ক্ষুণ্ণ হবে না; আইনটি কেবল দেশবিরোধী মনোভাব নিয়ে করা ইচ্ছাকৃত অপমান ও বিশৃঙ্খলা রুখতেই প্রযুক্ত হবে। তো সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে, দেশের জাতীয় প্রতীক ও পরম শ্রদ্ধেয় জাতীয় গীতকে আইনি বর্ম পরিয়ে বিশ্ব দরবারে ভারতের সম্মান ও গরিমাকে আরও উজ্জ্বল করতে মোদি সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ সত্যিই এক গর্বিত, সংহতিপূর্ণ ও আত্মনির্ভর ভারতের অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে।