কয়লার মারাত্মক ঘাটতি ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা কাটিয়ে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক রেকর্ডের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল পশ্চিমবঙ্গ! দীর্ঘদিনের খরা ও উৎপাদন সমস্যাকে চিরতরে পেছনে ফেলে এবার নিজের একশো শতাংশ চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত কয়লা খোলা বাজারে বিক্রি করতে শুরু করল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম বা ডব্লিউবিপিডিসিএল। আর এই অভাবনীয় বাণিজ্যিক সাফল্যের প্রথম ধাপে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থা এনটিপিসি অর্থাৎ ‘ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন’-কে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বৃত্ত কয়লা সরবরাহ করার মাধ্যমে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল রাজ্য সরকার।
কয়েক বছর আগের পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যাবে— এই বাংলাতেই কয়লার জোগানের প্রায় ৮৫ শতাংশের জন্য বাইরের খনি বা কোল ইন্ডিয়ার ওপর পুরোপুরি মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকতে হতো। সেই চরম পরনির্ভরশীলতার ছবিটা মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছে। তথ্য বলছে— ২০১৯-২০ আর্থিক বছরে ডব্লিউবিপিডিসিএল-কে যখন ক্যাপটিভ কয়লা ব্লক বণ্টন করা হয়, তখন নিজস্ব খনি থেকে নামমাত্র ১.৯২ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হতো, আর কোল ইন্ডিয়ার থেকে নিতে হতো প্রায় ১২.৫৭ মিলিয়ন টন। কিন্তু সেই প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটিয়ে খনিগুলির কাজ যুদ্ধকালীন গতিতে এগিয়ে নিয়ে আসায় ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ থেকেই বিপ্লব ঘটে যায়। কোল ইন্ডিয়ার কাছ থেকে কয়লা ক্রয়ের পরিমাণ সোজা নেমে আসে শূন্যে!
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন এক অভাবনীয় জায়গায় পৌঁছেছে যে, রাজ্যের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে দৈনিক গড় কয়লার ব্যবহার প্রায় ৬০ হাজার টন হওয়া সত্ত্বেও নিজস্ব খনিগুলি থেকে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি কয়লা উত্তোলিত হচ্ছে। অর্থাৎ নিজেদের একশো শতাংশ চাহিদা মিটিয়েও ডব্লিউবিপিডিসিএল-এর হাতে এখন মজুত রয়েছে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত কয়লা।
এই বিশাল মজুতকে ফেলে না রেখে এবং অপচয়ের সুযোগ না দিয়ে, কেন্দ্র সরকারের প্রণীত ‘এমএমডিআর আইন ২০২১’ বা মাইনস অ্যান্ড মিনারেলস ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যাক্টের নিয়ম মেনেই বাণিজ্যিকভাবে তা বাজারে বিক্রির বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এনটিপিসির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে মোট ০.৫ মিলিয়ন টন বা ৫ লক্ষ টন কয়লা সরবরাহের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে, যা সরাসরি বিপুল অংকের রাজস্ব এনে দিচ্ছে রাজ্যের সরকারি কোষাগারে।
এখানেই থেমে থাকা নয়, কয়লা বাণিজ্যের এই গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে আগামী ২০২৭ সালের মার্চ মাসের মধ্যে খোলা বাজারে মোট ৩.৫ মিলিয়ন টন উদ্বৃত্ত কয়লা বিক্রির এক মেগা লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে ডব্লিউবিপিডিসিএল। একসময় যে কয়লার অভাবে লোডশেডিং আর পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় কাঁপত রাজ্য, সঠিক পরিকাঠামো উন্নয়ন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার জোরে আজ সেই রাজ্যই কয়লা উদ্বৃত্ত শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয়ে গোটা দেশের বিদ্যুৎ মানচিত্রে আত্মমর্যাদার এক অনন্য নজির গড়ে তুলল।