রাজ্যে ঐতিহাসিক ক্ষমতা বদলের পর এটাই প্রথম শারদোৎসব। আর সেই নতুন সরকারের আমলেই শারদ সম্মানের খোলনলচে বদলে গিয়ে প্রকাশ্যে এলো মেধা, শিল্পকলা এবং ঐতিহ্যের প্রকৃত স্বীকৃতির এক অনন্য নিদর্শন! রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, কলকাতা পুরসভা এবং কলকাতা পুলিশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বহু প্রতীক্ষিত ‘দেবী দুর্গা সম্মান ২০২৬’-এর চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক ভাবনার মেলবন্ধনে সেজে ওঠা মোট ২৩টি প্রথম সারির পুজো কমিটিকে এই বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করেছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। আর এই বিচারে অতীতের সমস্ত রাজনৈতিক হিসেবনিকেশ ও বৈষম্যকে পেছনে ফেলে ‘সেরার সেরা’র রাজমুকুট ছিনিয়ে নিয়েছে উত্তর ও মধ্য কলকাতার অহংকার সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার!
বিগত সরকারের জমানায় যে সমস্ত পুজো কমিটি নানা কারণে সরকারি স্বীকৃতি থেকে ব্রাত্য থাকত বলে অভিযোগ উঠত, পালাবদলের বঙ্গে এবার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে শিল্পকলা, প্রতিমা, মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এবং সামাজিক সচেতনতার ওপর ভিত্তি করে পুজো বাছাই করা হয়েছে। শুভেন্দু সরকারের প্রথম ‘দেবী দুর্গা সম্মান ২০২৬’-এর বিচারে ‘সেরার সেরা’ বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেছে সজল ঘোষের সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার। এই বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে বৃন্দাবন গার্ডেন দুর্গোৎসব সমিতি এবং তৃতীয় স্থানের সম্মান ছিনিয়ে নিয়েছে উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি।
প্রতিমার শৈল্পিক উৎকর্ষের নিরিখে ‘সেরা প্রতিমা’ বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ কলকাতার মুদিয়ালি ক্লাব। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এই বিভাগের দ্বিতীয় স্থানটি দখল করেছে উত্তর কলকাতার টালা বারোয়ারি। এছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে জায়গা করে নিয়েছে যথাক্রমে বেহালা অরুণোদয় সমিতি এবং আহিরীটোলা সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি।
স্থাপত্য ও ভাবনার অভিনবত্বে ‘সেরা মণ্ডপ’-এর শিরোপা ছিনিয়ে নিয়েছে দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় পুজো খিদিরপুর ২৫ পল্লি। মণ্ডপ সজ্জার এই বিভাগে দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছে ‘আমরা ক’জন কল্যাণ সমিতি’। অন্যদিকে রাতের তিলোত্তমাকে আলোর রোশনাইয়ে ভরিয়ে তোলার জন্য ‘সেরা আলোকসজ্জা’ বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেছে সন্তোষপুর অ্যাভিনিউ সাউথ। এই তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান পেয়েছে যথাক্রমে দক্ষিণ কলকাতার বকুলবাগান সর্বজনীন এবং শিবমন্দির সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি।
পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দিয়ে ‘পরিবেশবান্ধব’ পুজোর নিরিখে প্রথম পুরস্কার জিতে নিয়েছে নলিন সরকার স্ট্রিট। এই বিভাগে দ্বিতীয় পুরস্কার জিতে বিশেষ নজর কেড়েছে পার্কস্ট্রিট অ্যালেন পার্কের পুজো, এবং তৃতীয় স্থানে জায়গা করে নিয়েছে রাজডাঙা নব উদয় সংঘ। মণ্ডপের মাধ্যমে সমাজকে পথ দেখানোর ক্ষেত্রে ‘সেরা সমাজ সচেতনতা’ বিভাগে প্রথম পুরস্কার পেয়েছে কাশী বোস লেন। এর পাশাপাশি দ্বিতীয় হয়েছে বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন, তৃতীয় চক্রবেড়িয়া সর্বজনীন এবং চতুর্থ স্থান দখল করেছে অজেয় সংহতি।
শহরের মূল স্রোতের পাশাপাশি ঐতিহ্যের আবহকে সম্মান জানাতে আরও চারটি পুজো কমিটিকে দেওয়া হয়েছে ‘বিশেষ পুরস্কার’। এই বিশেষ সম্মানপ্রাপ্তদের তালিকায় জ্বলজ্বল করছে বি.জি লাইন্স আবাসিক দুর্গাপূজা কমিটি, শ্যাম স্কোয়ার, ঠাকুরপুকুর এসবি পার্ক এবং সমাজসেবী সংঘ।
রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও প্রশাসনিক তোষণের ঊর্ধ্বে উঠে কলকাতার প্রতিটি প্রান্তের শিল্পীদের অক্লান্ত পরিশ্রমকে সম্মান জানানোর এই উদ্যোগ প্রমাণ করে দিল— পালাবদলের নতুন বাংলায় শারদোৎসবের বিচার এখন আর দলীয় আনুগত্যে নয়, বরং শিল্প ও মানুষের ভালোবাসার আলোতেই নির্ধারিত হচ্ছে!