শুরু হচ্ছে কি ‘অপারেশন মণিপুর’? মোদী সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ!

মণিপুরে ২০২৩ সাল থেকে চলা জাতিগত সংঘাত রাজ্যের সামাজিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এই সংঘাতের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার। অভিযোগ রয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্রসহ বিভিন্ন উৎস থেকে অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। আর তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। যে মানুষ শান্তিতে বাড়িতে থাকতে চান, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, তাঁদের মনেও তৈরি হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা। এই পরিস্থিতিতেই সামনে এসেছে ‘অপারেশন মণিপুর’-এর দাবি।

উদ্দেশ্য একটাই, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির অস্ত্রের ভান্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অভিযান কি সব পক্ষের ক্ষেত্রেই সমানভাবে কার্যকর হবে? এই দাবিকে আরও জোরালো করেছেন সাগোলবান্দের বিধায়ক আর কে ইমো সিংহ। তিনি রাজ্যপাল অজয় কুমার ভাল্লার কাছে চিঠি লিখে ‘অপারেশন মণিপুর’ শুরু করার অনুরোধ জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের অভিযান চালাতে হলে রাজ্য সরকার, মণিপুর পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

এই পরিকল্পনার আওতায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সশস্ত্র নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে, পাহাড়ি এলাকাগুলিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির চলাচল এবং অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যে কোনও অভিযানকে হতে হবে নিরপেক্ষ, আইনসম্মত এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত। কারণ, শান্তি ফেরানোর নামে কোনও নিরীহ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটাও নিশ্চিত করা জরুরি।

এবার আসা যাক আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। সাসপেনশন অব অপারেশনস, অর্থাৎ SOO চুক্তি। এই চুক্তির আওতায় থাকা কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিয়ম না মানার অভিযোগ উঠেছে। সেই কারণেই চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন আর কে ইমো সিংহ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, থাডৌ ইনপি মণিপুরের মতো সংগঠনও সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করার দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, কোনও গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে নয়, বরং সব পক্ষের ক্ষেত্রেই নিরস্ত্রীকরণের নীতি কার্যকর করতে হবে।
যারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে।

ধরা যাক, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বড়সড় অভিযান শুরু হলো। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো। কিন্তু তাতেই কি মণিপুরের সংঘাত পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে?
বাস্তবতা বলছে, শুধু অস্ত্র উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়। প্রথমত, অস্ত্রের অবৈধ সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যাঁরা সহিংসতায় জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনও একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। চতুর্থত, সংঘাতের কারণে ঘরছাড়া মানুষদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। আর পঞ্চমত, মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

মণিপুরের সাধারণ মানুষের চাহিদা খুবই স্পষ্ট। তাঁরা আর সংঘাত চান না। তাঁরা চান নিরাপদে বাড়ি ফিরতে। শিশুরা আবার স্কুলে যাক, কলেজে পড়াশোনা স্বাভাবিক হোক, ব্যবসা-বাণিজ্য ফিরে আসুক আগের ছন্দে।
যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুত হয়ে রয়েছেন, তাঁরা চান নিজেদের বাড়িতে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করতে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ, স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সব পক্ষের প্রতি সমান আইনি দৃষ্টিভঙ্গি। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে নিরাপত্তার পাশাপাশি পুনর্বাসন, পুনর্মিলন এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *