শুভেন্দুর হাতে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা তুলে দিয়ে কেঁদে ফেললেন ৯০ বছরের বৃদ্ধ !

চারিদিকে কড়া পুলিশি নিরাপত্তা, সাইরেনের আওয়াজ আর প্রশাসনিক তৎপরতা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপে জেলা প্রশাসনের মেগা রিভিউ মিটিংয়ে যোগ দিতে তখন প্রবেশ করছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ির গতি স্তব্ধ হওয়া বা সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সেই লোহার মতো আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা বেষ্টনী নিমেষের মধ্যে ভেঙে পড়ল এক পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার টানে! ভিড়ের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা গেরুয়া বসন পরা এক অশীতিপর বৃদ্ধকে দেখেই মাঝপথে থমকে গেল মুখ্যমন্ত্রীর বুলেটপ্রুফ গাড়ি। নিরাপত্তারক্ষীদের বার্তা দিয়ে ডেকে নেওয়া হলো তাঁকে, আর তার পরেই ঘটে গেল এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা, যা আজ গোটা সুন্দরবনবাসীর মন জয় করে নিয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে কাকদ্বীপ রবীন্দ্র ভবনের প্রবেশদ্বারে। জানা গিয়েছে, ৮ নম্বর লটের বাসিন্দা ৯০ বছর বয়সী প্রবীণ নাগরিক জ্ঞানেন্দ্র সরকার দীর্ঘক্ষণ ধরে রাস্তার ধারে ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন। পরনে ছিল গেরুয়া বসন, আর হাতে ধরা একটি সাধারণ কাপড়ের ব্যাগ— যার ভেতরে সযত্নে রাখা ছিল পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’। জীবনের সায়াহ্নে এসে তাঁর একমাত্র শেষ ইচ্ছা ছিল, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে একবার চোখের সামনে দেখা এবং নিজের হাতে এই পবিত্র গীতাটি তাঁর কাছে সমর্পণ করা। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তার জেরে সেই সুযোগ আদৌ মিলবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয়ে ছিলেন বৃদ্ধ।

ঠিক তখনই প্রশাসনিক বৈঠকের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্র ভবনে প্রবেশ করছিল মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি। ভিড়ের মাঝে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা সেই প্রবীণ বৃদ্ধকে লক্ষ্য করা মাত্রই চালককে গাড়ি থামানোর নির্দেশ দেন শুভেন্দু অধিকারী। কনভয় দাঁড় করিয়ে তিনি নিরাপত্তারক্ষীদের মাধ্যমে জ্ঞানেন্দ্রবাবুকে সসম্মানে নিজের গাড়ির পাশে ডেকে নেন। স্বপ্নের মতো সেই মুহূর্তে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে একেবারে হাতছোঁয়া দূরত্বে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন নব্বইয়ের বৃদ্ধ। কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যাগ থেকে বের করে শুভেন্দু অধিকারীর হাতে তুলে দেন শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা।

উপহার পেয়ে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না করে পরম শ্রদ্ধায় সেই গীতাটি নিজের কপালে ঠেকান মুখ্যমন্ত্রী। পরম স্নেহে বৃদ্ধের হাত ধরে শুভেন্দু অধিকারী বলেন— “আপনি ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আমাকে আশীর্বাদ করুন।” নিজের আরাধ্য উপহার এভাবে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান সসম্মানে গ্রহণ করায় আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন জ্ঞানেন্দ্রবাবু। চোখ মুছতে মুছতে তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রীর এই আন্তরিকতা ও নম্রতা তাঁর জীবনের সেরা প্রাপ্তি।

এই আবেগঘন পর্বের পর কাকদ্বীপের রবীন্দ্র ভবনে প্রবেশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন শুভেন্দু অধিকারী।

এদিনের প্রশাসনিক বৈঠকে ফুটে ওঠে এক বিরল রাজনৈতিক সৌজন্য ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের ছবি। জেলার শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তাদের পাশাপাশি এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পাথরপ্রতিমার তৃণমূল বিধায়ক সমীর জানা, মথুরাপুরের তৃণমূল সাংসদ বাপি হালদার এবং গোসাবার বিজেপি বিধায়ক বিকর্ণ নস্কর। আসন্ন গঙ্গাসাগর মেলাকে নির্বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক মানের ও তীর্থযাত্রীদের জন্য সুরক্ষিত করে তুলতে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরকে একগুচ্ছ কড়া নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী।

তবে সমস্ত প্রশাসনিক পর্যালোচনা ও মেগা বৈঠকের ব্যস্ততাকে ছাপিয়ে, কাকদ্বীপের রাজপথে কনভয় থামিয়ে এক নিঃস্ব বৃদ্ধের ভক্তিকে সম্মান জানানোর এই দৃশ্য প্রমাণ করে দিল— ক্ষমতার শীর্ষাসনে থাকলেও মাটির মানুষের আবেগের মূল্য শুভেন্দু অধিকারীর কাছে আজও অমূল্য!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *