কলকাতা পুরসভার নির্বাচন নিয়ে রাজ্য নির্বাচন কমিশন ও বর্তমান শাসক দলের আঁতাত এবং তাড়াহুড়োর কঙ্কালসার চেহারাটা এবার সর্বদলীয় বৈঠকেই একেবারে নগ্ন হয়ে গেল! একদিকে ১৪৪ থেকে বাড়িয়ে ওয়ার্ড সংখ্যা ২০৯ করা হয়েছে, অথচ বুথের কোনো চূড়ান্ত ও বৈধ তালিকা পর্যন্ত নেই। আর তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সবচেয়ে মারাত্মক ও সুগভীর ষড়যন্ত্রটি হলো— বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে এসআইআর প্রক্রিয়ার নামে যে হাজার হাজার যোগ্য ভোটারের নাম অন্যায়ভাবে তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল, তাঁদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে না দিয়েই পিছনের দরজা দিয়ে তড়িঘড়ি পুরভোট সেরে ফেলার হীন চক্রান্ত!
কিন্তু মঙ্গলবার দক্ষিণ কলকাতার জেলাশাসকের দফতরে আয়োজিত সর্বদলীয় বৈঠকে সেই অগণতান্ত্রিক ছকে সরাসরি জল ঢেলে দিয়েছে বিরোধী দলগুলি। একসুরে তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে— যোগ্য নাগরিকদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে না দিলে রাজ্যে কোনোভাবেই কোনো পুরভোট হতে দেওয়া হবে না!
কমিশনের ডাকা ওই বৈঠকে ২০৯টি ওয়ার্ডের বুথের খসড়া তালিকা প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার বা আইওয়াশ করার চেষ্টা হলেও, বিরোধীরা সেই ফাঁদে পা দেয়নি। তাদের স্পষ্ট কথা, শুধুমাত্র বুথের তালিকা তৈরি করে প্রহসন চালালে চলবে না। আসল এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি জড়িত ভোটার তালিকাকে কেন্দ্র করে। যে লক্ষ লক্ষ যোগ্য নাগরিককে রাজনৈতিক অভিসন্ধি নিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নির্মমভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, অবিলম্বে তাঁদের নাম পুনরায় সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
রাজ্য নির্বাচন কমিশন আগামী ১০ই নভেম্বর বুথের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে দ্রুত নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারির যে নীল-নকশা তৈরি করেছে, তা আদতে ওই বাদ পড়া ভোটারদের পাকাপাকিভাবে তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করারই এক নির্লজ্জ স্বৈরতান্ত্রিক ছক মাত্র। সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হলো, ভোটার তালিকা সংশোধন ও বাদ পড়া মানুষদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে এখনও পর্যন্ত টুঁ শব্দটিও খরচ করেনি রাজ্য নির্বাচন কমিশন! নিয়ম অনুযায়ী আগামী ৫ই জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা রয়েছে। সেই সঠিক তালিকা গ্রহণ করে বাদ পড়া ভোটারদের নাম যুক্ত করার পথে হাঁটলে স্বাভাবিকভাবেই পুরভোটের সময়সূচি কিছুটা পিছোবে। আর শাসক দল বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে কমিশন ঠিক সেটাই হতে দিতে চাইছে না! রাতের অন্ধকারে পুরভোট সেরে নেওয়ার এই মরিয়া প্রচেষ্টা আসলে গণতন্ত্রের টুঁটি টিপে ধরে কণ্ঠরোধ করারই শামিল।
বুথের সীমানা নির্ধারণের নামে এই প্রহসন আর ভোটার তালিকার বৈধতা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার রাজনীতি রাজ্যের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। তবে মঙ্গলবারের সর্বদলীয় বৈঠকে বিরোধীদের এই অনড় ও কঠোর অবস্থান পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছে যে, সাধারণ মানুষের মৌলিক ভোটাধিকার হরণ করে একতরফা নির্বাচন পার করানোর এই অগণতান্ত্রিক পথ বিন্দুমাত্র মসৃণ হবে না। অবিলম্বে সমস্ত যোগ্য ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিতেই হবে, অন্যথায় এই প্রহসনের নির্বাচন বাংলার সচেতন মানুষ কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
গণতন্ত্রের টুঁটি টিপে একতরফা নির্বাচন করার এই ঘৃণ্য চক্রান্তের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির এই কড়া অবস্থান আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে যে বড় সংঘর্ষের জন্ম দেবে, তা বলাই বাহুল্য।