পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার-সহ রাজ্যের পুলিশ আধিকারিকদের উদ্দেশে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কড়া হুঁশিয়ারি ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। তবে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের এই হুঁশিয়ারিকে কার্যত কোনও গুরুত্বই দিতে নারাজ প্রবীণ রাজনীতিবিদ তথা প্রাক্তন সাংসদ শিশির অধিকারী। শুধু তাই নয়, অভিষেককে সরাসরি ‘বাচ্চা ছেলে’ বলে কটাক্ষ করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, বাংলার রাজনীতিতে এখনও শিক্ষানবিশ অভিষেক। ফলে তাঁর হুমকিতে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই বলেই মনে করেন শিশির।
ঘটনার সূত্রপাত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানার ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তোলেন অভিষেক। তাঁর অভিযোগ, ভোটের ফল প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিক তাঁকে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন, তৃণমূল বিপুল ভোটে জয়ী হবে। কিন্তু বিজেপি জেতার পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। রাতের অন্ধকারে বৈঠক করে কীভাবে তৃণমূল কর্মীদের ফাঁসানো যায়, সেই চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অভিষেকের আরও অভিযোগ, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর মুখ্যমন্ত্রীকে খুশি করতে একাংশের পুলিশ আধিকারিক হাজার হাজার তৃণমূল কর্মীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, আইনকে উপেক্ষা করে যাঁরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করেছেন, তাঁদের কাউকেই ভবিষ্যতে রেয়াত করা হবে না। সরকার পরিবর্তনের পর এমন পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও কার্যত হুঁশিয়ারি দেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
এই পরিস্থিতিতে শিশির অধিকারীর প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অভিষেকের হুঁশিয়ারি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, অভিষেক একেবারেই বাচ্চা ছেলে। তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করতেও নাকি কষ্ট হয় শিশিরের। একসময় অভিষেককে যে অবস্থায় দেখেছেন, এখনও তাঁকে সেই অবস্থাতেই দেখতে চান বলে মন্তব্য করেন প্রবীণ এই নেতা। পাশাপাশি অভিষেককে রাজনীতির শিক্ষানবিশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অর্থাৎ অভিষেকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং পরিপক্বতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিলেন শিশির।
শুধু ব্যক্তিগত কটাক্ষেই থেমে থাকেননি শিশির অধিকারী। বাংলার রাজনীতির সঙ্গে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির তুলনা টেনে তাঁর দাবি, পটনা কিংবা উত্তর ভারতের অন্যত্র অভিষেকের এই ধরনের রাজনৈতিক ভাষা চলতে পারে, কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে তা কার্যকর হবে না। অভিষেকের হুমকির কোনও দাম নেই বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, অন্যকে দোষারোপ করার আগে অভিষেকের উচিত নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মোকাবিলা করা।
এরপর আরও একধাপ এগিয়ে অভিষেককে পাল্টা বার্তা দেন শিশির। তাঁর কথায়, আগে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে আদালত থেকে বেরিয়ে আসুন, তার পর অন্যদের নিয়ে কথা বলবেন। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে অভিষেককে ঘিরে থাকা আইনি বিতর্ককেও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এলেন তিনি। যদিও শিশিরের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আক্রমণের সুরেই এসেছে। ফলে দুই শিবিরের নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং পাল্টা আক্রমণের রাজনীতি যে আরও তীব্র হচ্ছে, তা বলাই যায়।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে শিশির অধিকারী বলেন, মোদিজি গড়ের মাঠে দাঁড়িয়ে জেলে যাওয়ার কথা বলে গিয়েছেন। একের পর এক নেতা জেলে যাবেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাই অভিষেকের বেশি হুমকি-ধমকি দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন শিশির। সব মিলিয়ে একদিকে অভিষেকের পুলিশ প্রশাসনকে ঘিরে কড়া বার্তা, অন্যদিকে শিশির অধিকারীর পাল্টা কটাক্ষ দুইয়ে মিলে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। পুলিশের ভূমিকা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, সবকিছুই এখন রাজনৈতিক তরজার কেন্দ্রে।