কলকাতার এক জমকালো কালীপুজোর উদ্বোধনী মঞ্চে তখন মন্ত্রী, বিধায়ক আর প্রশাসনিক শীর্ষ কর্তাদের ভিড়। উত্তরীয় আর স্মারক দিয়ে চলছে সংবর্ধনা পর্ব। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল এক অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় দৃশ্য! পাশের অন্য একটি মণ্ডপ থেকে ভেসে আসা ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের সুর কানে পৌঁছতেই সমস্ত প্রোটোকল ভেঙে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুধু উঠে দাঁড়ানোই নয়, মাইকের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে খালি গলায় জাতীয় স্তোত্র গাইতে শুরু করলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর এই স্বতঃস্ফূর্ত দেশপ্রেম দেখে প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেলেও, মুহূর্তের মধ্যে মঞ্চে উপস্থিত মন্ত্রী, প্রশাসনিক আধিকারিক থেকে শুরু করে শত শত সাধারণ দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে সমস্বরে গলা মেলালেন ‘বন্দে মাতরম’-এ। শুক্রবার রাতে উত্তর কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটে ধরা পড়ল এমনই এক বিরল ও আবেগঘন মুহূর্ত!
ঘটনাটি ঘটেছে আমহার্স্ট স্ট্রিট লাগোয়া রাজা রামমোহন রায় সরণিতে, ঐতিহ্যবাহী ‘আমহার্স্ট স্ট্রিট যুবশ্রী সঙ্ঘ’-এর কালীপুজো প্রাঙ্গণে। ক্লাব সভাপতি তথা বর্তমান শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই জনপ্রিয় পুজোটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পুজোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন পর্ব নির্বিঘ্নে শেষ হওয়ার পর মণ্ডপের ঠিক উল্টো দিকে তৈরি বিশাল মূল মঞ্চে শুরু হয়েছিল সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় সহ মঞ্চে তখন উপস্থিত ছিলেন একাধিক বিধায়ক, আমলা এবং স্বয়ং কলকাতা পুরসভার কমিশনার। চাঁদের হাটে পরিণত হওয়া সেই মঞ্চে একের পর এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে তখন উত্তরীয়, পুষ্পস্তবক ও স্মারক তুলে দিয়ে সম্মান জানাচ্ছিলেন উদ্যোক্তারা।
ঠিক সেই সময়ই ঘটে সেই নাটকীয় ঘটনা। কিছুটা দূরে অবস্থিত অন্য একটি কালীপুজোর মণ্ডপে তখন মাইকে পরিবেশিত হচ্ছিল ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম’। দূর থেকে ভেসে আসা সেই সুর ও শব্দ কানে আসতেই আর এক মুহূর্তও নিজের আসনে বসে থাকেননি মুখ্যমন্ত্রী। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান চলাকালীনই তিনি তৎক্ষণাৎ চেয়ার ছেড়ে সোজা টানটান হয়ে উঠে দাঁড়ান এবং সুর মিলিয়ে গাইতে শুরু করেন।
মুখ্যমন্ত্রীকে এভাবে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে গান গাইতে দেখে প্রথম কয়েক সেকেন্ডের জন্য কিছুটা হকচকিয়ে যান মঞ্চে থাকা অন্যান্য অতিথিরা। কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে এক এক করে উঠে দাঁড়ান শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, উপস্থিত বিধায়কেরা এবং পুর কমিশনার সহ তাবড় আধিকারিকরা। মঞ্চের সাথে তাল মিলিয়ে অডিটোরিয়াম ও প্যান্ডেল চত্বরে থাকা সাধারণ দর্শকরাও দাঁড়িয়ে সমবেত কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে থাকেন।
সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রীর অনুষ্ঠানের মাঝে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, তার জন্য উদ্যোক্তারা প্রথমে পাশের মণ্ডপের মাইকের আওয়াজ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন— জাতীয় সঙ্গীত বা দেশাত্মবোধক গানকে কোনোভাবেই থামানো যাবে না। তিনি নিজেই সেই গান শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন। গান সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পরেই যুবশ্রী সঙ্ঘের মঞ্চে ফের স্বাভাবিক সংবর্ধনা পর্ব শুরু হয়।
উল্লেখ্য, বঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাজ্যের সমস্ত সরকারি বিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কার্যালয়ে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া এবং পাঠ্যবইয়ের প্রথম পাতায় তা মুদ্রিত করার কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে কোনো প্রশাসনিক নির্দেশ বা কড়াকড়ির বাইরে গিয়ে, পুজোর এক সাধারণ মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর এমন নিঃশর্ত ও আন্তরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন উপস্থিত সকলের মন ছুঁয়ে গেছে।
কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, সুর ও শ্রদ্ধার মেলবন্ধনে উত্তর কলকাতার বুকে দেশপ্রেমের এই অনন্য নজির যে রাজনৈতিক মহলেও এক গভীর বার্তা পৌঁছে দিল, তা বলাই বাহুল্য!