২৬-এর মহাযুদ্ধের দামামা বেজে গিয়েছে। আর এই যুদ্ধের এপিসেন্টার বা কেন্দ্রবিন্দু এখন দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর। বৃহস্পতিবার হাজরার মোড় থেকে যখন শুভেন্দু অধিকারী মনোনয়ন জমা দিতে বেরোলেন, তখন তার পাশে স্বয়ং অমিত শাহ । যাকে বলা হয় ভারতের রাজনৈতিক চাণক্য । তাই তার একটা কথা রাজনীতির ময়দানের কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা নতুন করে বলে দিতে হয়না। সাধারণ মানুষ ভাবছিলেন, কেন ভবানীপুরকে এতো গুরুত্ব দিচ্ছে বিজেপি? আর সেই ধন্দই এক নিমেষে উড়িয়ে দিলেন শাহ। তাঁর সাফ কথা, ‘আমার কাছে একটা শর্টকাট আছে— ভবানীপুর জিতলেই নবান্ন দখল নিশ্চিত!’ এই একটি বাক্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল, এবার আর কোনো রক্ষণাত্মক খেলা নয়, তৃণমূলের খাসতালুকে ঢুকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল ভারতীয় জনতা পার্টি।
গত নির্বাচনে নন্দীগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী দেখিয়ে দিয়েছিলেন, অপরাজেয় বলে কেউ হয় না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন। কিন্তু এবার লক্ষ্য আরও বড়। শাহের কথায় উঠে এলো এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুভেন্দু এবারও তাঁর পুরনো গড় নন্দীগ্রাম থেকেই লড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ ছিল স্পষ্ট— মমতার ঘরে ঢুকে তাঁকে পর্যুদস্ত করতে হবে। ভবানীপুর যদি তৃণমূলের দুর্গ হয়, তবে সেই দুর্গের পতন ঘটাতেই সেনাপতি হিসেবে পাঠানো হয়েছে শুভেন্দুকে। শাহের এই রণকৌশল প্রমাণ করছে যে, বিজেপি এবার কেবল ভোটে লড়ছে না, তারা পরিবর্তনের চূড়ান্ত ব্লু-প্রিন্ট পকেটেই নিয়ে এসেছে। আর তাঁরা শুধু তৃণমূল সরকারকে হাটাতে চায়না তারা চায় মমতা ব্যানার্জী নামটাই রাজনীতি থেকে মুছে দিতে ।
অমিত শাহ কেবল আশার কথা শোনাননি, শুনিয়েছেন এক সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান। তাঁর দাবি, বাংলায় এবার বিজেপি ১৭০-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে যাবে। তাঁর যুক্তি অত্যন্ত পরিষ্কার— যেখানেই যাচ্ছেন, মানুষের চোখেমুখে দেখছেন মমতা সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ আর মোদীজির উন্নয়নের প্রতি গভীর আস্থা। হাজরার সেই সভা থেকে শাহ স্পষ্ট করে দিলেন, ভবানীপুর জয় কেবল একটি আসন জেতা নয়, এটি আসলে এক বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সংকেত। তিনি ভবানীপুরের ভোটারদের কাছে সরাসরি আবেদন জানিয়েছেন— ‘বাংলার ভবিষ্যতের জন্য, বাংলাকে দুর্নীতির হাত থেকে বাঁচাতে শুভেন্দু অধিকারীকে বিপুল ভোটে জেতাতে হবে।’ এই আত্মবিশ্বাস কোনো ভিত্তিহীন দাবি নয়, বরং বুথ স্তরের সুসংগঠিত প্রস্তুতিরই বহিঃপ্রকাশ।
এছাড়াও আরও একটি বড় ঘোষণা বিরোধীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভোটের সময় টানা ১৫ দিন তিনি বাংলার মাটিতেই পড়ে থাকবেন। জেলায় জেলায় ঘুরবেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন।
বিজেপির এই অল-আউট অ্যাটাক কৌশল বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহর কাছে এবারের পশ্চিমবঙ্গ জয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির মসনদে বসে কেবল রিমোট কন্ট্রোল চালানো নয়, একেবারে ময়দানে নেমে মানুষের মনের পালস বোঝা এবং কর্মীদের চাঙ্গা করাই শাহের প্রধান লক্ষ্য। মোদী-শাহ জুটির এই উপস্থিতি বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে যে জোয়ার এনেছে, তা আটকানোর ক্ষমতা সম্ভবত কোনো বিরোধীরই নেই।
সব শেষে বলা যায়, ভবানীপুরের এই মনোনয়ন ঘিরে যে উন্মাদনা দেখা গেল, তা পরিবর্তনের সলতে পাকানোর কাজ সেরে ফেলেছে। শুভেন্দুর লড়াকু মেজাজ আর অমিত শাহের দূরদর্শী কৌশল, এই দুইয়ের মেলবন্ধনে এবার নবান্নের রাস্তা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে বিজেপির জন্য।
শর্টকাট হোক বা লং-কাট, বিজেপির লক্ষ্য একটাই— সোনার বাংলা গড়ে তোলা। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, কারণ চাণক্যের চাল যখন শুরু হয়েছে, তখন তার শেষ হবে বিজয় তিলকের মাধ্যমেই।