বাংলায় ভোট শুরু হয়ে গিয়েছে। তাই জোর কদমে চলছে প্রচার পর্ব। এমতাবস্থায় বঙ্গে দেখা মিলছে গেরুয়া শিবিরের বহু জনপ্রতিনিধিদেরও। আর এবার বাংলার প্রচারের ময়দানে নামতে চলেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। সূত্রের খবর, প্রায় এক ডজনেরও বেশি কর্মসূচিতে অংশ নিতে চলেছেন তিনি। রবিবার থেকেই প্রচারে দেখা মিলবে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, এবারের নির্বাচনে বাংলায় বেশ বড়সড় ঝড় তুলতে চলেছে বিজেপি। বলে রাখা ভালো, পদ্ম শিবিরের নেতা-কর্মীদের কাছে যোগী আদিত্যনাথ শুধু একজন মুখ্যমন্ত্রী নন, তিনি হিন্দুত্ব রাজনীতির এক অন্যতম মুখ। উত্তরপ্রদেশে তার অপরাধ দমনে ‘বুলডোজার’ নীতি এবং দৃঢ় অবস্থান জাতীয় স্তরে আলাদা এক পরিচিতি দিয়েছে তাকে। আর এবার সেই ভাবমূর্তিকেই সামনে রেখে বাংলার ভোটে হিন্দুত্বের বার্তা জোরালো করতে চাইছে মোদী-শাহ।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ১২ই এপ্রিল থেকেই নিজের কর্মসূচি শুরু করবেন যোগী আদিত্যনাথ। প্রথম দিনই তার বাঁকুড়ার পাত্রসায়ের ও পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে হাই-ভোল্টেজ জনসভা করার কথা রয়েছে। যদিও বিজেপি-র কাছে উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ প্রায় সব অঞ্চল থেকেই যোগীর জনসভা করানোর অনুরোধ ইতিমধ্যেই আসতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, বাংলার বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা নিয়েই নিজের জনসভায় মূল ভাষণ রাখবেন যোগী। তবে, অনুপ্রবেশে ইস্যু-ও এক্ষেত্রে স্থান পেতে পারে বলে অনেকের ধারণা রয়েছে। জানা যাচ্ছে, বাঁকুড়ার সোনামুখী থেকে নন্দকুমার-সহ ২০টিরও বেশি জায়গায় সভা করার পরিকল্পনা রয়েছে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর। যদিও সে কর্মসূচি আপাতত সামনে আসেনি।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, বাংলায় যোগী আদিত্যনাথের পা রাখার মূল উদ্দেশ্য তৃণমূলের বিরুদ্ধে নিজেদের সংগঠনের লড়াইকে আরও কিছুটা সক্রিয় করার এক প্রচেষ্টা হতে পারে। আসলে বিজেপি প্রায়ই বাংলায় ‘মাফিয়া রাজ’ বা ‘তোষণ রাজনীতির’ অভিযোগ তোলে। আর এর বিপরীতে যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপকে তারা সুশাসনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে। ফলে “UP-তে পারলে বাংলায় কেন নয়?”—এই প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে দেওয়ার এক চেষ্টা হতে পারে যোগীর আগমন। তাছাড়া, পশ্চিমবঙ্গের শিল্পাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গে একটি বড় অংশ হিন্দিভাষী এবং আদিবাসী ভোটার রয়েছেন। সেক্ষেত্রে যোগী আদিত্যনাথের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এই ভোটব্যাঙ্ক-কে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। তার সোজা-সাপ্টা কথা বলার ধরণ এবং আক্রমণাত্মক ভাষণ তরুণ কর্মীদের উৎসাহিত করতে পারে।
এখানেই শেষ নয়, যোগী আদিত্যনাথের কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভাবমূর্তি গেরুয়া শিবিরের সমর্থকদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা তৈরি করবে বলেও মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন জেলা বা যেখানে ধর্মীয় জনসংখ্যা একটি বড় ফ্যাক্টর, সেখানে ভোটারদের এককাট্টা করতে এবং ধর্মীয় মেরুকরণকে শক্তিশালী করতে বিজেপি যোগীকে ব্যবহার করতে চাইছে। অর্থাৎ, যোগী আদিত্যনাথকে বাংলায় আনা বিজেপির একটি সুচিন্তিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। যার দ্বারা দলটির লক্ষ্য কেবল ভোট বাড়ানো নয়, বরং বাংলার রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী ধারণাকে আরও জোরালো করা। যদিও বিরোধীরা তাকে “বহিরাগত” বা “বিভেদকামী” বলেই সমালোচনা করেন। কিন্তু বিজেপি মনে করে বাংলার মাটিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শক্তিশালী নেত্রীর মোকাবিলা করতে যোগীর মতো একজন কঠোর ও স্পষ্টবাদী নেতার ভাবমূর্তি প্রয়োজন। এক কথায়, আগ্রাসী প্রচার ও হিন্দু ভোটকে ঐক্যবদ্ধ করাই হল বাংলায় যোগীকে আনার মূল উদ্দেশ্য।