বাংলায় ঐতিহাসিক পালাবদলের পর মাত্র দুটো মাস কেটেছে। আর এই অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যের শূন্য কোষাগার ভরিয়ে নজিরবিহীন রেকর্ড গড়ল নতুন বিজেপি সরকার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জমানার আর্থিক পরিচালনার গলদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ক্ষমতায় আসার প্রথম এক মাসেই অতিরিক্ত ১,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে দেখাল শুভেন্দু অধিকারী সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় সূত্রের এই চাঞ্চল্যকর খতিয়ান সামনে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে।
গত ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। পরিসংখ্যান বলছে, ৯ মে থেকে ৯ জুন পর্যন্ত মাত্র এক মাসে সরকারের যে বিপুল রাজস্ব আদায় হয়েছে, তা গত আর্থিক বছরের ঠিক একই সময়সীমার তুলনায় ১ হাজার কোটি টাকা বেশি। কোনো নতুন কর না চাপিয়ে, স্রেফ আগের জমানার প্রাতিষ্ঠানিক ‘লিকেজ’ বা চুরির রাস্তা বন্ধ করেই এই বিপুল আর্থিক লাভ সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে সিএমও। মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি অভিযোগ, আগের জমানায় রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার এই সুসংগঠিত ব্যবস্থাটি ছিল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নবান্নের উচ্চপর্যায়ের মদতপুষ্ট এক মেগা কেলেঙ্কারি।
দুর্নীতির গভীরতা বোঝাতে মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় একটি চোখ কপালে তোলার মতো উদাহরণ দিয়েছে। বীরভূমের একটি নির্দিষ্ট পাথর খাদান থেকে আগের সরকারের আমলে বছরে মোট রাজস্ব আদায় হতো মাত্র ৬০ কোটি টাকা। অথচ, বাংলায় সরকার বদলের পর মাফিয়ারাজ ও লিকেজ বন্ধ করতেই দেখা যাচ্ছে, ওই একই খাদান থেকে এখন প্রতি মাসেই আদায় হচ্ছে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কোটি টাকা! অর্থাৎ, আগে যা বছরে আসত, সততার সঙ্গে কড়া নজরদারি চালাতেই এখন এক মাসেই তার চেয়ে বেশি টাকা জমা পড়ছে সরকারি তহবিলে। বালি, কয়লা, পাথর খাদানের পাশাপাশি আবগারি দপ্তরের রাজস্ব আদায়ের ওপরেও কড়া স্ক্যানার বসানো হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে জানিয়েছেন, এতদিন সরকারি কোষাগারে না ঢুকে রাজ্যের এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঘুরপথে চলে যেত কলকাতার হাই-প্রোফাইল ঠিকানা ক্যামাক স্ট্রিটে। সেখান থেকে হাওয়ালা মারফত সেই কালো টাকা সোজা পাচার হয়ে যেত দুবাই কিংবা করের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন ভুয়ো বা শেল কোম্পানিতে। এমনকি এই লুঠের টাকার একটা বড় অংশ ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে ঘুরিয়ে তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢোকানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ বর্তমান প্রশাসনের।
এই সমস্ত রাজস্ব লুঠের খতিয়ান এবার আমজনতার সামনে আনতে চলেছে বর্তমান সরকার। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর নেতৃত্বে ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ ‘মন্ত্রিগোষ্ঠী’ গঠন করা হয়েছে, যা এই দুর্নীতির খতিয়ান নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করবে। ইডির সাম্প্রতিক ৪৪০ কোটি টাকা ফ্রিজ করার ঘটনার আবহে নবান্নের এই বিপুল রাজস্ব বৃদ্ধির খতিয়ান তৃণমূলের অস্বস্তি যে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল, তা বলাই বাহুল্য। রাজনৈতিক মহলের মতে, নতুন সরকারের এই আর্থিক ‘ম্যাজিক’ আগামী দিনে বাংলার সামগ্রিক উন্নয়নকে কতটা ত্বরান্বিত করে, এখন সেটাই দেখার।
তবে রাজস্ব ফাঁকির এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের পর, রাজ্যের শাসক-বিরোধী রাজনৈতিক তরজা যে আগামী দিনে আরও চরম রূপ নেবে, তা বলাই বাহুল্য।