“পুলিশ হোক বা পুজো কমিটি, দোষীদের কাউকেই রেয়াত নয়!” চোরবাগান বিপর্যয়ে সিট প্রধানের নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি !

শারদোৎসবের আলো ঝলমলে আবহে উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনা কেবল ১৯টি তরতাজা প্রাণই কেড়ে নেয়নি, গোটা বাংলার বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। উৎসবের মাঝখানে নেমে আসা সেই কালরাত্রির আসল সত্য ও অন্ধকার উৎস খুঁজে বের করতে হাইকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করেছে রাজ্য সরকার। আর এই হাইভোল্টেজ তদন্ত দলের মাথায় বসানো হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীকে। এই সংবেদনশীল ও গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও নির্ভীক বার্তা দিলেন সিট প্রধান— “পুলিশ হোক বা পুজো কমিটি, গাফিলতি যাঁরই থাক, কাউকেই একচুল ছাড় দেওয়া হবে না!”

সাক্ষাৎকারে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার মুহূর্ত থেকেই তাঁর পুজো মাটি হয়ে গিয়েছিল। তবে হাইকোর্টের নির্দেশে এত বড় একটি নিরপেক্ষ তদন্তের ভার তাঁর ওপর এসে পড়বে, তা তিনি ভাবেননি। কিন্তু দায়িত্ব যখন এসেছে, তখন কোনো রকম আপস না করে দুর্ঘটনার নেপথ্যে থাকা আসল কারণ ও আসল অপরাধীদের জনসমক্ষে আনাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

তদন্তের রূপরেখা তুলে ধরে তিনি জানান— যেকোনো বড় পুজো মণ্ডপেই ভিড় আর আলো-আঁধারির পরিবেশ থাকে, কিন্তু অতীতে কখনও চোরবাগানের মতো এমন নারকীয় বিপর্যয় ঘটেনি। তাই ঠিক কোন পর্যায়ে কার গাফিলতি বা গলদ ছিল, তা নির্ধারণ করতে তিনি প্রথমেই সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন। মূল দোষী পুজো কমিটি, পুলিশ নাকি অন্য কোনো প্রশাসনিক সংস্থা— তা না দেখে কেবল সত্যের আলোতেই তদন্তের গতিপথ নির্ধারিত হবে।

সরকারি তদন্ত কমিটি সাধারণত দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে— এই প্রচলিত ধারণাকে সরাসরি উড়িয়ে দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বলেন, রাজ্য সরকার তদন্ত শেষের জন্য তিন মাসের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে এবং মুখ্যমন্ত্রী এই তদন্ত নিয়ে অত্যন্ত আন্তরিক। সুপ্রিম কোর্টের নিয়ম মেনেই এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হয়েছে। সময় কিছুটা কম হলেও, তিন মাসের আগেই যাতে অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়, তার জন্য দিনরাত এক করে কাজ করবে সিট।

চোরবাগানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছেন সিট প্রধান। দশমীর দিনে সেখানে কোনো দেবীবরণ হয়নি, কেবল প্রথা মেনে ঘট বিসর্জন করা হয়েছে; কিন্তু প্রতিমা নিরঞ্জন এখনো থমকে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন— “ঘটনাস্থল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার আগে প্রতিমা বা মণ্ডপে কোনো রকম হাত দেওয়া যাবে না। তদন্তের স্বার্থে মণ্ডপ ও প্রতিমা বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে, ঠিক সেই অবস্থাতেই রাখতে হবে।”

তদন্তের পরবর্তী ধাপে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী দর্শনার্থী থেকে শুরু করে পুজো উদ্যোক্তা, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ আধিকারিক, দমকল কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবক— সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পক্ষকে দফায় দফায় তলব করে ম্যারাথন জেরা শুরু করতে চলেছে সিট। ১৯টি পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদের বিচার পেতে গোটা বাংলা এখন তাকিয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর এই নিরপেক্ষ ও আপসহীন তদন্তের দিকে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *