ওপার বাংলা থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর নাগরিকত্বের প্রশ্নে এবার এক চূড়ান্ত ও ঐতিহাসিক সময়সীমা বেঁধে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী! দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং প্রশাসনিক ঢিলেমির অবসান ঘটিয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন— চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই রাজ্যের সমস্ত বকেয়া সিএএ (CAA) আবেদনের শুনানি সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনায় যেখানে আবেদনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সেখানে মহকুমা স্তরে বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে এই কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য প্রশাসন।
নদিয়ার এক জনবহুল অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান— ২০১৯ সালে প্রণীত হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন অর্থাৎ সিএএ-র বিধি ২০২৪ সালের ১১ মার্চ কার্যকর হলেও, বিগত তৃণমূল সরকারের প্রত্যক্ষ অসহযোগিতার কারণে রাজ্যে এই প্রক্রিয়া মুখ থুবড়ে পড়েছিল। আবেদন জমা পড়া সত্ত্বেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শুনানির ব্যবস্থা না করায় এখনও পর্যন্ত প্রায় আড়াই লক্ষ শরণার্থীর আবেদন ফাইলবন্দি হয়ে পেন্ডিং অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যার মধ্যে সিংহভাগই মতুয়া ও নমশূদ্র অধ্যুষিত নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনার সাধারণ মানুষের।
তবে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পরিস্থিতি যে সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে, তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান— কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক রাজ্যকে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় সমস্ত ক্ষমতা ও গাইডলাইন প্রদান করেছে। দ্রুত শুনানির জন্য জেলাশাসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং আবেদনের সরাসরি যাচাই ও শুনানির চূড়ান্ত দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে মহকুমা শাসকদের (SDO) হাতে। শুভেন্দু অধিকারীর কড়া আশ্বাস— “আগামী ৩১ ডিসেম্বরের পর রাজ্যে একটিও যোগ্য শরণার্থীর সিএএ আবেদন পেন্ডিং থাকবে না। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সমস্ত নিপীড়িত মানুষের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের সরকারের অগ্রাধিকার।”
নাগরিকত্বের আশ্বাসের পাশাপাশি রাজ্যের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা ও উৎসবের পরিবেশ নিয়েও বিগত জমানাকে চাঁচাছোলা ভাষায় বিঁধেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন— অতীতে দুর্গাপূজা বা বিসর্জনের অনুমতি পেতে যেখানে উদ্যোক্তাদের বারবার আদালতের দরজায় কড়া নাড়তে হতো, সেখানে বর্তমান জমানায় রেকর্ডসংখ্যক প্রায় ১১ হাজার নতুন পুজোকে নির্বিঘ্নে অনুমতি ও সরকারি সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোনো পুজো কমিটিকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়নি। রাজ্যে নারী সুরক্ষা নিয়ে সরকারের কড়া নজরদারির কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশাসনকে নির্দেশ দেন— আসন্ন জগদ্ধাত্রী পূজা এবং শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও সুবিধার ক্ষেত্রে যেন বিন্দুমাত্র খামতি না থাকে।
২০২৩ সালে বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন যে শতদল ক্লাবের পুজো উদ্বোধন করেছিলেন শুভেন্দু, মুখ্যমন্ত্রী হয়েও এবার সেই ক্লাবের মণ্ডপেই হাজির হয়ে তিনি স্পষ্ট করে দিলেন— জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে মতুয়া ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল, প্রান্তিক মানুষের আবেগ ও অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে নবান্ন কোনো আপস করবে না।
আড়াই লক্ষ পেন্ডিং আবেদনের নিষ্পত্তিতে ৩১ ডিসেম্বরের এই সুনির্দিষ্ট ডেডলাইন— সীমান্তবর্তী বাংলার শরণার্থী রাজনীতি ও সামাজিক সমীকরণে যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!
