পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন স্বচ্ছতা আনতে এবং সাধারণ গরীব মানুষের সঠিক চিকিৎসা সুনিশ্চিত করতে এবার এক যুগান্তকারী ও অত্যন্ত কঠোরতম প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করল রাজ্যের নতুন সরকার। সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের একাংশের লাগাতার ডিউটি ফাঁকি দেওয়া এবং প্রাইভেট নার্সিংহোমে ব্যস্ত থাকার পুরনো ও নোংরা সংস্কৃতিকে চিরতরে উপড়ে ফেলতে এক মেগা হুঁশিয়ারি জারি করেছেন রাজ্যের নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজ্যের ২৬টি মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপালদের কাছ থেকে আসা লাগাতার অভিযোগের ভিত্তিতে চিকিৎসকদের কর্তব্যপরায়ণতা ফেরাতে কোমর বেঁধে নেমেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রক।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় সমস্ত সরকারি চিকিৎসকদের নির্দেশ দিয়ে জানিয়েছেন যে, সরকারি হাসপাতালের ডিউটি আওয়ার্সের মধ্যে কোনোভাবেই কোনো রকম ব্যক্তিগত বা প্রাইভেট প্র্যাকটিস বরদাস্ত করা হবে না। জনগণকে নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা দেওয়ার জন্য সরকার যেখানে মোটা অঙ্কের বেতন দিচ্ছে, সেখানে নিয়মের অন্যথা হলে কিংবা সপ্তাহে অন্তত ৯৬ ঘণ্টার এই বাধ্যতামূলক ডিউটি আওয়ার্স পছন্দ না হলে চিকিৎসকদের সরাসরি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সাফ বার্তা দিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি বারাসাত মেডিকেল কলেজে আচমকা পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে চরম অনিয়ম ও পৈশাচিক গাফিলতি স্বচক্ষে দেখেছেন, তা আজ গোটা রাজ্যের চিকিৎসকদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সেখানে ডিউটি আওয়ার্সে একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল স্ত্রী রোগ বা প্রসূতি বিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন না এবং খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, তিনি সরকারি হাসপাতাল ফেলে পাশের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে সিজারিয়ান সেকশন ডেলিভারি করাতে চলে গিয়েছেন। এই চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে শারদ্বত মুখোপাধ্যায় সাফ জানিয়েছেন যে, তিনি যেমন চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ঠিক তেমনই রাজ্যের কোটি কোটি অসহায় রোগীদেরও স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাই প্রফেশনাল এথিক্স বা পেশার সম্মান রক্ষার্থে প্রফেসর, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ও অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরদের অবিলম্বে নিজেদের নাম ও ডিগ্রির প্রতি সুবিচার করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
অনেক চিকিৎসক নিজেদের সরকারি টিচিং হাসপাতালের গম্ভীর পদমর্যাদা ব্যবহার করে প্রাইভেট নার্সিংহোমে নোঙর করে বসে থাকেন এবং সেখানে সরকারি হাসপাতালের রোগীদের লম্বা লাইন তৈরি করে এক ধরণের কৃত্রিম মহিমান্বিত রূপ দেখানোর চেষ্টা করেন যে, তাঁরা নার্সিংহোমে টাকা নেন না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী কড়া ভাষায় এই দ্বিচারিতার মুখোশ খুলে দিয়ে বলেছেন, কোনো ডাক্তার এখানে চ্যারিটি বা দয়া করছেন না; জনগণের ট্যাক্সের বা করের টাকায় প্রতি মাসে তাঁদের বেতন হচ্ছে, তাই ডিউটি আওয়ার্সে তাঁদের হাসপাতালেই থাকতে হবে।
এর পাশাপাশি চিকিৎসকদের বদলি বা ট্রান্সফার নিয়ে চলা বছরের পর বছর ধরে চলে আসা নানা অজুহাত ও জালিয়াতি বন্ধ করতেও এক অভিনব ও কঠোর নীতি ঘোষণা করেছে নতুন সরকার। সাধারণত দেখা যায়, কোনো চিকিৎসকের বদলির নির্দেশ গেলেই বাবা-মার অসুস্থতা কিংবা সন্তানের অটিজম বা বিহেভিয়ারাল ডিজঅর্ডারের চেনা অজুহাত ও সার্টিফিকেট নিয়ে প্রশাসনের দোরে দোরে চক্কর কাটা শুরু হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ৫৫ বছর বয়সী একজন চিকিৎসকের বাবা-মা প্রবীণ ও অসুস্থ হওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু বদলি আটকাতে এই কারণ দেখালে এখন থেকে উচ্চপর্যায়ের ক্রস চেক বা সত্যতা যাচাই করা হবে।
এমনকি কোনো নন-টিচিং হাসপাতালের দেওয়া মানসিক বা সাইকিয়াট্রিক সার্টিফিকেট বদলি আটকানোর ক্ষেত্রে গ্রাহ্য হবে না এবং একটানা পাঁচ বছর এক জায়গায় কর্মরত থাকলে চিকিৎসকদের ট্রান্সফার ১০০ শতাংশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে লড়াকু ও সৎ চিকিৎসকদের সুবিধার্থে হোম সিটিতে ফেরত আসার একটি চমৎকার ও মানবিক পলিসিও তৈরি করেছে নতুন সরকার। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকা, উত্তরের পার্বত্য দুর্গম অঞ্চল, আসাম ও সিকিম সংলগ্ন সীমান্ত এলাকা এবং জঙ্গলমহলের মতো অত্যন্ত কঠিন বা ‘হাই ডিফিকাল্টি এরিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত জায়গাগুলোতে চিকিৎসকদের ডিউটি করার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার পর হোম টাউনে ফিরে আসার ‘টাইম বাউন্ড রিটার্ন পলিসি’ তৈরি করা হয়েছে। তো তোষণ ও চিকিৎসায় গাফিলতির অন্ধকার যুগ শেষ করে, বাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও রোগী বান্ধব করে তুলতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের এই বলিষ্ঠ ও সময়োপযোগী চাবুক সত্যিই এক নতুন ও সুস্থ বাংলার অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে।