দীর্ঘ বিতর্ক, আইনি লড়াই এবং টানা দু’বছর পুজো বন্ধ থাকার পর ফের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে নিউটাউনের সনাতনী দুর্গাপুজো কমিটি। পালাবদলের পর নতুন উদ্যমে এবার দুর্গাপুজো আয়োজনের পরিকল্পনা শুরু করেছে উদ্যোক্তারা। শুধু পুজো ফেরানোই নয়, প্রথমবার থিম পুজোর মাধ্যমে কলকাতার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠার লক্ষ্যও নিয়েছে এই কমিটি। উদ্যোক্তাদের দাবি, এবারের আয়োজন হবে আগের তুলনায় অনেক বড় এবং দর্শকদের জন্য থাকবে একাধিক নতুন চমক।
নিউটাউনের এই দুর্গাপুজো প্রথম শুরু হয় ২০২২ সালে। তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর উদ্যোগে পুজো কমিটি গঠিত হয় এবং তিনিই সেই বছরের পুজোর উদ্বোধন করেন। কিন্তু উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, কমিটির নামে থাকা ‘সনাতনী’ শব্দকে কেন্দ্র করে তৎকালীন শাসকদলের আপত্তির মুখে পড়তে হয়। প্রশাসনিক অনুমতি পেতে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পথও বেছে নিতে হয়েছিল তাঁদের।
পুজো কমিটির দাবি, শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে অনুমতি মিললেও প্রস্তুতির জন্য খুব কম সময় হাতে ছিল। ফলে ২০২২ সালে সীমিত পরিসরে দুর্গাপুজো আয়োজন করতে হয়। এরপর ২০২৩ সালেও নানা বাধার মধ্যেই পুজো সম্পন্ন হয়। তবে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, পরপর দু’বছর সরকারি পুজো অনুদান থেকেও তাঁদের বঞ্চিত করা হয়েছিল। যদিও তাঁরা জানিয়েছেন, কোনওদিনই সরকারি অনুদানের উপর নির্ভর করে পুজো করার পরিকল্পনা ছিল না।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, আদালতের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও নানা প্রশাসনিক ও স্থানীয় সমস্যার কারণে ওই দুই বছর পুজো করা সম্ভব হয়নি। ফলে টানা দু’বছর বন্ধ থাকে নিউটাউনের সনাতনী দুর্গাপুজো। সেই সময় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও বিস্তর আলোচনা হয়েছিল।
এবার রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ফের আশার আলো দেখছেন উদ্যোক্তারা। ইতিমধ্যেই পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আগামী ২৪ জুলাই খুঁটিপুজোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে এবারের আয়োজনের। অনুষ্ঠানে কার্তিক মহারাজ এবং নির্গুণানন্দ মহারাজ উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। পাশাপাশি এবারের পুজোর উদ্বোধনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছে পুজো কমিটি।
শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, এবারের পুজোর মূল আকর্ষণ হতে চলেছে অভিনব থিম। শিল্পী সুবল পালের পরিকল্পনায় ‘সনাতনী থেকে বিজ্ঞান’—এই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হবে মণ্ডপ। সমাজের বিবর্তনের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার সমন্বয়কে তুলে ধরা হবে শিল্পকর্মের মাধ্যমে। প্রতিমায় থাকবে সাবেকিয়ানার ছোঁয়া এবং কৃষ্ণনগরের দক্ষ মৃৎশিল্পীদের হাতেই তৈরি হবে দেবীমূর্তি।
উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, এবারের লক্ষ্য শুধুমাত্র পুজো আয়োজন নয়; বরং উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার নামী থিম পুজোগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামা। দর্শকদের নতুন অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা এবং শিল্প ভাবনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের আশা, প্রথমবার থিম পুজোর ময়দানে নেমেই নিউটাউনের সনাতনী দুর্গাপুজো শহরের অন্যতম আলোচিত পুজো হয়ে উঠবে।
রাজনৈতিক বিতর্ক, আদালতের লড়াই এবং একাধিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে এবার নতুন অধ্যায় শুরু করতে চলেছে এই পুজো কমিটি। পালাবদলের পর বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেই প্রত্যাবর্তন কতটা সফল হয়, আর দর্শকদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে শহরবাসীর।