মন্দির ভাঙা হলেও নিজের জায়গাতেই অটল বজরংবলী!উজ্জয়িনীর ‘খড়ে হনুমান’-কে ঘিরে তুঙ্গে ভক্তি ও যুক্তির লড়াই

একদিকে রাস্তা চওড়া করার কাজ, অন্যদিকে শতবর্ষের বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল হনুমান মূর্তি।
মন্দিরের কাঠামো ভেঙে ফেলা গেলেও, কিছুতেই সরানো গেল না সেই মূর্তি। বারবার চেষ্টা করেও যখন একচুলও নড়ল না বজরংবলীর বিগ্রহ, তখনই ছড়িয়ে পড়ল ‘অলৌকিক’ কাণ্ডের দাবি। ভক্তদের বিশ্বাস, নিজের জায়গা ছেড়ে যেতে চান না হনুমানজি। যদিও বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, এর পিছনে থাকতে পারে একেবারেই বাস্তব কারণ।

২০২৮ সালের সিংহস্থ মহাকুম্ভকে সামনে রেখে উজ্জয়িনীতে চলছে রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ। কাঁঠাল চৌরাস্তা থেকে ছত্রী চক পর্যন্ত রাস্তা চওড়া করার পরিকল্পনার আওতায় পড়েছে সতী গেটের খড়ে হনুমান মন্দিরও। লোকমতে, ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির প্রায় ১৭০ বছরের পুরনো। রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য পুরনো মন্দিরের কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়। এরপরই শুরু হয় আসল সমস্যা। ট্যাঙ্কি চকে থাকা বিশাল হনুমান মূর্তিটি অন্যত্র সরানোর চেষ্টা করেন পৌরনিগমের কর্মীরা। জেসিবি-সহ একাধিক ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও মূর্তিটিকে নড়ানো সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, গত তিন দিনে চারবার মূর্তি সরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে সেই চেষ্টা। প্রায় ৪০ ঘণ্টা ধরে নানা পদ্ধতিতে চেষ্টা চললেও দণ্ডায়মান হনুমানজিকে মাটি থেকে একচুলও সরানো যায়নি। এরপরই ঘটনাস্থলে ভিড় বাড়তে থাকে স্থানীয় ভক্ত ও বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের সদস্যদের। মন্দির ভাঙার দৃশ্য দেখে অনেক ভক্তের চোখে জল আসে। তাঁদের বক্তব্য, এই মন্দির শুধু একটি ইট-পাথরের কাঠামো নয়, এটি এলাকার হাজার হাজার মানুষের বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পবিত্র স্থান। পুরোহিত এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলিও প্রশাসনের কাছে ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আবেদন জানিয়েছে।

ভক্তদের একাংশের দাবি, ১৭০ বছর ধরে যে স্থানে হনুমানজি বিরাজ করছেন, সেখান থেকে তিনি নিজেই সরে যেতে চাইছেন না। সেই কারণেই নাকি যতই চেষ্টা করা হচ্ছে, মূর্তিকে একচুলও নড়ানো যাচ্ছে না। এই ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক ভিডিও।
নেটিজেনদের একাংশও এটিকে ‘হনুমানজির লীলা’ বলে দাবি করছেন। তবে এর পাশাপাশি সামনে আসছে অন্য একটি ব্যাখ্যাও। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় আট ফুট উচ্চতার এই পাথরের মূর্তিটির একটি বড় অংশ মাটির গভীরে প্রথিত রয়েছে। ফলে মূর্তিটির ওজন এবং মাটির নীচে তার অবস্থান দুই কারণেই সেটিকে সরানো কঠিন হয়ে থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

মূর্তিটির ইতিহাস নিয়েও রয়েছে নানা দাবি। স্থানীয়দের একাংশের মতে, এই প্রাচীন হনুমান মন্দিরের সঙ্গে পারমার রাজবংশ এবং রাজা ভোজের সময়কালের যোগ থাকতে পারে। সেই দাবি সত্যি হলে মূর্তিটির বয়স হাজার বছর পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই দাবির পক্ষে এখনও নিশ্চিত ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মেলেনি। মন্দিরের প্রধান পুরোহিত পণ্ডিত মহেশ বৈরাগীর পরিবারও বংশপরম্পরায় এই মন্দিরে হনুমানজির সেবা করে আসছে বলে জানা যায়। এখন প্রশাসনের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ, কোনওরকম ক্ষতি না করে কীভাবে বিশাল এই বিগ্রহকে সরানো যায়। জানা গিয়েছে, প্রশাসন এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি দল মাটির নীচে মূর্তিটির অবস্থান এবং গঠন সম্পর্কে জানতে বিশেষ ভূমি-পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করবে।
তারপরই ঠিক হবে, মূর্তিটি আদৌ কীভাবে স্থানান্তর করা সম্ভব। এই মুহূর্তে মন্দিরের কাঠামো ভেঙে গেলেও অক্ষত রয়েছে হনুমানজির বিগ্রহ। আপাতত তাকে ছাউনির নীচে রাখা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *