নন্দীগ্রামের ঐতিহাসিক রণক্ষেত্রে ফের মুখোমুখি লড়াইয়ের যে টানটান উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তাতে এক বড়সড় ইতি টানলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছেড়ে দেওয়া সেই প্রেস্টিজ সিট নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করার খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল বিরোধীরা। এমনকি পদ্মশিবিরের তরফে স্পষ্ট বলা হয়েছিল— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে প্রার্থী হলে নন্দীগ্রামের মাটিতে তাঁকে কড়া জবাব দেওয়া হবে। কিন্তু সমস্ত জল্পনাকে পেছনে ফেলে নন্দীগ্রামে দাঁড়ানোর সেই মহা চ্যালেঞ্জ কার্যত এড়িয়ে গেলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। নিজের বদলে নন্দীগ্রামে মমতা শিবির প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করেছে সঞ্চিতা প্রধান (দে)-এর, এবং একই সাথে রেজিনগর উপনির্বাচনে টিকিট দেওয়া হয়েছে প্রাক্তন বিধায়ক রবিউল আলম চৌধুরীকে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পিছিয়ে আসার পরই তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। অত্যন্ত কটাক্ষের সুরে মমতাকে ‘ডক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়’ বলে সম্বোধন করে তিনি মনে করিয়ে দেন— প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কখনো সাধারণ বিধানসভা নির্বাচনে পূর্ণ শক্তির লড়াইয়ে জিতে আসতে পারেন না, উপনির্বাচনের নিরাপদ রাস্তা খুঁজে পেলেই তিনি বিধানসভার দরজা দেখতেন। ঋতব্রত খোঁচা দিয়ে বলেন— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি নিজে নন্দীগ্রামের ময়দানে দাঁড়ানোর সাহস দেখাতেন, তবে হয়তো তাঁরা সেখানে কোনো প্রার্থীই দিতেন না শুভেন্দু অধিকারীর এই শক্ত ঘাঁটিতে। কিন্তু যেহেতু মমতা নিজে ময়দান ছেড়ে পালিয়েছেন, তাই সোমবারই ঋতব্রত শিবির নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে নিজস্ব প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে লড়াইয়ের ময়দানে নামতে চলেছে।
তবে প্রার্থী ঘোষণা করলেও মমতা শিবিরের আসল বিপদ কিন্তু এখনো কাটেনি। দলের নাম এবং অতি পরিচিত ‘জোড়াফুল’ প্রতীক কার দখলে থাকবে— সেই বিষয়টি এখনো নির্বাচন কমিশনের বিবেচনাধীন। ফলে মমতা শিবিরের প্রার্থীরা আদৌ সেই চেনা প্রতীকে ভোট লড়তে পারবেন, নাকি কোনো নতুন ও অপরিচিত প্রতীকে তাঁদের লড়াইয়ে নামতে হবে, তা নির্ভর করছে সম্পূর্ণ কমিশনের সিলমোহরের ওপর। দুই শিবিরই ইতিমধ্যেই কমিশনের দ্বারস্থ হয়ে নিজেদের দাবি জানিয়ে এসেছে।
এদিকে বিরোধী মহাজোটের সমস্ত সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে দুই আসনেই এককভাবে লড়াইয়ের রণডঙ্কা বাজিয়ে দিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস। নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনের পরিচিত মুখ ও বর্ষীয়ান নেতা মিলন প্রধানকে প্রার্থী করেছে হাত শিবির। অন্যদিকে রেজিনগরে কংগ্রেস বাজি ধরেছে মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের বিরোধী দলনেতা তথা বলিষ্ঠ সংগঠক মহম্মদ আবদুল্লাহিল কাফিকে।
একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ময়দান থেকে পিছু হটা, অন্যদিকে জোড়াফুল শিবিরের অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও প্রতীক সংকট— সব মিলিয়ে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের লড়াই এক নতুন মোড় নিল। একদিকে বিরোধীদের প্রার্থী জট ও প্রতীক অনিশ্চয়তা, আর অন্যদিকে বিজেপি নেতৃত্বের ঘরের ভূমিপুত্রদের নিয়ে সুসংগঠিত প্রস্তুতি— শুভেন্দুর ছেড়ে যাওয়া কেন্দ্রে পদ্মশিবিরের জয়ের পথ কি এবার অনেকটাই মসৃণ হয়ে গেল? এই প্রশ্নই এখন কাঁপিয়ে দিচ্ছে গোটা বঙ্গ রাজনীতিকে!