শারদোৎসবের দিনগুলোতে যখন শ্রীভূমি, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার কিংবা চেতলা অগ্রণীর সামনে উপচে পড়ে জনস্রোত, তখন তিলোত্তমার সবচেয়ে জমকালো ও ব্যস্ততম এলাকা পার্ক স্ট্রিটের রাস্তাঘাট থাকত তুলনামূলক ফাঁকা আর নিস্তব্ধ। বড়দিনের আলোয় মেতে ওঠা যে অ্যালেন পার্ক এতদিন কেবল ডিসেম্বরের কেক আর ক্রিসমাস কার্নিভালের জন্যই চেনা ছিল, এবার সেখানে লেখা হতে চলেছে এক অভাবনীয় ও ঐতিহাসিক রূপরেখা! কলকাতার রাজপথে ছড়িয়ে পড়া ‘কে আসছে?’ লেখা রহস্যময় টিজার হোর্ডিংয়ের পর্দা অবশেষে উঠল। বড়দিনের বহু আগেই এবার খোদ পার্ক স্ট্রিটের বুকে প্রথমবার আড়ম্বরপূর্ণ দুর্গাপূজার আয়োজন করতে চলেছে ‘কলকাতা সনাতনী সঙ্ঘ’। আর এই ঐতিহাসিক শারদ আয়োজনের মহা উদ্বোধন করবেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী!
এই অভিনব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে শহরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে পারদ ইতিমধ্যেই চড়তে শুরু করেছে। কলকাতা সনাতনী সঙ্ঘের সম্পাদক নবীন মিশ্র, যিনি ইতিপূর্বে উপনির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারীর নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব সামলেছিলেন, তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন— বিগত সরকারের আমলে বারবার চেষ্টা করেও অ্যালেন পার্কে দুর্গাপূজার প্রশাসনিক অনুমতি মেলেনি। কিন্তু রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটতেই সেই দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি শঙ্কুদেব পণ্ডা জানিয়েছেন, গণেশ চতুর্থীর দিন শুভ তিথিতে ভূমিপূজার মধ্য দিয়ে সূচনা হয়েছে এই কর্মযজ্ঞের, আর মহালয়ার ঠিক পরের দিনই স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী এসে এই পূজার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। শুধু তাই নয়, পুজো উপলক্ষে বিজেপি-শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের পাশাপাশি জাতীয় স্তরের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতির জোরালো ইঙ্গিত মিলেছে।
চেহারার দিক থেকেও ব্রিটিশ ঐতিহ্যমণ্ডিত অ্যালেন পার্কে আনা হচ্ছে এক আমূল বৈপ্লবিক বদল। এতদিন পার্ক স্ট্রিট জুড়ে যে পরিচিত নীল-সাদা রঙের আধিপত্য ছিল, তা সম্পূর্ণ মুছে দিয়ে এবার সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে সনাতন সংস্কৃতির প্রতীক রুদ্রাক্ষের পবিত্র আভা! শিল্পী সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় গড়ে উঠছে বিশাল মণ্ডপ, তবে মা দুর্গার প্রতিমার শৈল্পিক রূপ নিয়ে চূড়ান্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে রাখা হয়েছে চরম চমক।
উৎসবের আলো শুধু অ্যালেন পার্কেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বড়দিনের প্রায় দু’মাস আগেই ধর্মতলা মোড় থেকে মল্লিকবাজার পর্যন্ত সুদীর্ঘ দুই কিলোমিটার রাস্তা সেজে উঠছে তাক লাগানো আলোকমালায়। এই সজ্জার এক অংশে আলো ছড়িয়ে দেবেন চন্দননগরের বিখ্যাত শিল্পীরা, আর অন্য অংশের দায়িত্বে থাকছেন কাঁথির দক্ষ আলোকশিল্পীরা। মহালয়া থেকে টানা স্তোত্রপাঠ, চতুর্থী থেকে জাতীয় স্তরের শিল্পীদের সাংস্কৃতিক আসর এবং মহাষ্টমীর সন্ধ্যায় এক হাজার প্রদীপের মহা আরতি— সব মিলিয়ে এক নতুন ইতিহাস তৈরি হতে চলেছে। আয়োজকদের সাফ বার্তা— বড়দিনকে অস্বীকার করে নয়, বরং সনাতন দুর্গাপূজা ও ক্রিসমাসের মেলবন্ধনে পার্ক স্ট্রিট এবার তুলে ধরবে সত্যিকারের ঐতিহ্য ও গৌরবের এক অনন্য নজির।