মাথার ওপর ভাঙাচোরা কাঁচা মাটির ছাদ বদলে একটা পাকা ঘরের স্বপ্ন দেখেছিলেন বীরভূমের দুবরাজপুরের অত্যন্ত দরিদ্র দিনমজুর আলেনুর। সরকারি আবাস যোজনার প্রথম কিস্তির টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়তেই ধারদেনা করে শুরু করেছিলেন সেই স্বপ্নের ঘরের কাজ। কিন্তু ঘর সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই নেমে এল চরম বিপর্যয়! প্রশাসনের তরফ থেকে পাঠানো হলো কড়া নোটিশ— অ্যাকাউন্টে ঢোকা সেই প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা অবিলম্বে সরকারকে ফেরত দিতে হবে, অন্যথায় নেওয়া হবে ফৌজদারি ও আইনি পদক্ষেপ! আধখানা তৈরি হয়ে যাওয়া ইটের দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে এখন মাথায় হাত আলেনুর ও তাঁর পরিবারের।
ঘটনাটি বীরভূমের দুবরাজপুর ব্লকের লক্ষ্মীনারায়ণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের আদমপুর গ্রামের। সংসারে সুনির্দিষ্ট কোনো আয়ের পথ নেই, চরম আর্থিক অনটনের মধ্যেই মাটির চালার ঘরে কোনোমতে দিন কাটে আলেনুরের পরিবারের। চলতি বছরে নির্বাচনের মুখে সরকারি সমীক্ষার পর আবাস যোজনার চূড়ান্ত তালিকায় নাম ওঠে তাঁর। এরপরই সমস্ত সরকারি নিয়ম মেনে তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে বাড়ি তৈরির প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা। সেই টাকা হাতে আসতেই আর দেরি করেননি তিনি। কাঁচা বাড়ি ভেঙে পাকা বাড়ির ভিত তৈরি করে চারপাশের দেওয়াল তোলার কাজও প্রায় শেষ করে ফেলেন। কিন্তু ছাদ ঢালাইয়ের সময় অর্থের টানাটানি শুরু হওয়ায় সাময়িকভাবে কাজ আটকে যায়।
আর ঠিক এই চরম অসহায় পরিস্থিতির মাঝেই বিডিও অফিস থেকে এসে পৌঁছায় সেই বিভীষিকাময় নোটিশ! চিঠিতে সাফ জানানো হয়েছে— পরবর্তীতে পুনর্বিবেচনা ও যাচাই করে দেখা গিয়েছে আলেনুর নাকি এই আবাস প্রকল্পের নিয়মানুযায়ী উপযুক্ত উপভোক্তা নন। তাই প্রথম কিস্তিতে পাওয়া সম্পূর্ণ ৬০ হাজার টাকা অবিলম্বে ব্লক উন্নয়ন আধিকারিকের দফতরে জমা দিতে হবে। টাকা ফেরত না দিলে তাঁর বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
এই নোটিশ হাতে আসতেই ঘুম উড়ে গিয়েছে গোটা পরিবারের। কান্নায় ভেঙে পড়ে আলেনুরের পরিবারের দাবি— এসআইআরের সময় ভোটার তালিকা সংক্রান্ত জটিলতায় হয়তো কোনো নাম বাদ পড়েছিল, কিন্তু সেই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ত্রুটির দায় কেন গরিব উপভোক্তার কাঁধে চাপানো হবে? প্রথম কিস্তির সম্পূর্ণ অর্থ ইতিমধ্যেই তো ইট, সিমেন্ট আর বালিতে খরচ হয়ে ঘরের কাঠামোয় রূপ নিয়েছে। এই অবস্থায় ৬০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার মতো কানাকড়িও তাঁদের কাছে নেই। তাহলে কি আধখানা তৈরি ঘর ভেঙে জেল খাটতে হবে? এই অমানবিক সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা চেয়ে এবং পাকা ছাদটুকু রক্ষার করুণ আর্তি নিয়ে এখন স্থানীয় প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে চোখের জল ফেলছেন বীরভূমের এই পরিবার।