ভোটের ময়দানে নামার আগেই এক চরম ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ল তৃণমূল কংগ্রেস! নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের হাইভোল্টেজ উপনির্বাচনের ঠিক মুখে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দিল তাদের নজিরবিহীন ও চূড়ান্ত রায়— দলের অতি পরিচিত নাম ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং সেই ঐতিহাসিক প্রতীক ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ সম্পূর্ণ ফ্রিজ করে দেওয়া হলো! অর্থাৎ আগামী ৬ অক্টোবরের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাট শিবির কিংবা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহী শিবির— কোনো পক্ষই জোড়াফুল চিহ্ন বা তৃণমূল নাম ব্যবহার করে ভোট চাইতে পারবে না। দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও আইনি টানাপোড়েনের পর কমিশনের এই অন্তর্বর্তী নির্দেশে কার্যত রাজনৈতিকভাবে অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল ঘাসফুল শিবির।
বৃহস্পতিবার নির্বাচন সদনে দুই শিবিরের প্রতিনিধিদের দীর্ঘ শুনানি ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সহ কমিশনের শীর্ষ আধিকারিকরা। সেই ম্যারাথন বৈঠকের পরই জানিয়ে দেওয়া হয়— দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কোন্দল চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষকেই প্রতীক বা নাম ব্যবহারের অধিকার দেওয়া সম্ভব নয়। কমিশন নির্দেশ দিয়েছে— শুক্রবার সকাল ১১টার মধ্যে কমিশনের তালিকাভুক্ত ১৮৪টি ফ্রি চিহ্নের মধ্য থেকে উভয় পক্ষকেই পছন্দমাফিক তিনটি করে নতুন নাম ও প্রতীকের তালিকা জমা দিতে হবে। সেখান থেকেই দুই শিবিরের জন্য আলাদা আলাদা নাম ও প্রতীক বরাদ্দ করবে কমিশন। অর্থাৎ, উপনির্বাচনের রণক্ষেত্রে দুই শিবিরকেই কার্যত নতুন দল বা নির্দল প্রতীকে সাধারণ মানুষের সামনে যেতে হবে।
কমিশনের এই কড়া নির্দেশের পরই তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন কালীঘাট শিবিরের শীর্ষ নেতা তথা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই নির্দেশিকাকে পুরোপুরি ‘বেআইনি’ আখ্যা দিয়ে তিনি দাবি করেন— এই অর্ডারের ভেতরে আইনি বহু ফাঁকফোকর রয়েছে এবং তাঁরা কোনোভাবেই এই সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নিচ্ছেন না। তবে একই সাথে বিদ্রোহী শিবিরকে খোঁচা দিয়ে কল্যাণবাবু বলেন— “আমরা যেমন প্রতীক পেলাম না, ওরাও পেল না। যারা দাবি করছিল দল ওদের, নাম ওদের, তাদের হাতেও আজ শূন্য। তবে নতুন প্রতীক নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তা চেনানো যে এক বিরাট কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে, তা অস্বীকার করার জায়গা নেই।”
অন্যদিকে এই অন্তর্বর্তী নির্দেশকে গণতন্ত্রের জয় হিসেবে দেখছেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অত্যন্ত শাণিত সুরে মমতাকে নিশানা করে বলেন— “কমিশনের এই পদক্ষেপে একটি কথাই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রমাণিত হলো যে, আধুনিক গণতন্ত্রে কোনো স্বৈরতন্ত্র বা পরিবারবাদের জায়গা থাকতে পারে না।” দলীয় সহকর্মীদের সাথে বসেই তাঁরা দ্রুত নতুন প্রতীক চূড়ান্ত করবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে ঘাসফুল প্রতীক হাতছাড়া হতেই ময়দানে নেমে পড়েছে অন্য রাজনৈতিক দলগুলিও। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী একহাত নিয়ে মন্তব্য করেন— এটাই হওয়ার কথা ছিল। তৃণমূলের সিংহভাগ নেতাই এখন বিজেপিতে শামিল, আর যা পড়ে রয়েছে তাও একাধিক টুকরোয় বিভক্ত; বিরোধী দল হিসেবে এদের কোনো অস্তিত্বই নেই। তাই দুই শিবিরের মনোনয়ন বাতিলের দাবিও তোলেন তিনি। অন্যদিকে মমতা শিবিরের পাশে দাঁড়িয়ে কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব কমিশনকে তোপ দেগে অভিযোগ করেছে যে, এটি কেন্দ্রের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত। সব মিলিয়ে, একদিকে প্রতীক হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে তৃণমূলের দুই যুযুধান গোষ্ঠী, আর অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারীর সুসংগঠিত প্রশাসনের সামনে উপনির্বাচনে পদ্মের জয়জয়কার— এই পরিস্থিতি দেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেকটি হয়তো কমিশনের এই রায়ের মাধ্যমেই পোঁতা হয়ে গেল!