“থানায় সরাসরি কলকাতা থেকে অর্ডার আসত, স্যার বুঝে নিন!” তৃণমূল আমলের পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে রাজীব সিনহার বিরাট মন্তব্য

২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সেই রক্তক্ষয়ী অধ্যায় ও অবাধ ভোট লুটের অভিযোগ ঘিরে এবার বঙ্গ রাজনীতিতে ফাটল এক অবিশ্বাস্য পারমাণবিক বোমা! যে ভোটকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে হিংসার বলি হতে হয়েছিল বহু সাধারণ মানুষকে, বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়নে বাধা থেকে শুরু করে গণনাকেন্দ্রে ব্যালট বাক্স জলে ফেলে দেওয়ার ছবি গোটা দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল— সেই নির্বাচনের আসল সত্য এবার নিজের মুখেই ফাঁস করলেন তৎকালীন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা! দীর্ঘদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত আমলা হিসেবে কাজ করা রাজীব সিনহার এই একের পর এক চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে দিল— বিগত জমানায় রাজ্যের সমগ্র গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে কীভাবে কালীঘাটের অঙ্গুলিহেলনে পুতুলে পরিণত করা হয়েছিল!

প্রশাসনের সেই অন্ধকার চিত্র তুলে ধরে রাজীব সিনহা জানিয়েছেন— নির্বাচন কমিশনারের মতো সাংবিধানিক পদে বসেও তাঁর হাত-পা কার্যত বেঁধে রাখা হয়েছিল। ভোটের দিন বা গণনার সময় বুথ দখল ও রিগিংয়ের একের পর এক অভিযোগ পেয়ে তিনি যখন সরাসরি জেলার জেলাশাসকদের ফোন করতেন, তখন অসহায় ডিএম-রা সাফ জানাতেন যে জেলা পুলিশ সুপার তাঁদের নির্দেশ মানছেন না! এরপর যখন কমিশনার নিজে এসপি-দের ফোন করে কৈফিয়ত চাইতেন, তখন ওপার থেকে পুলিশ কর্তারা ঠান্ডা গলায় উত্তর দিতেন— “স্যার, আমাদের কিছু করার নেই; স্থানীয় থানায় সরাসরি কলকাতা থেকে অর্ডার আসছে।” আর সেই অলিখিত নির্দেশ কার পক্ষ থেকে আসত জানতে চাইলে পুলিশ কর্তাদের একটাই ইঙ্গিতপূর্ণ উত্তর থাকত— “স্যার, বুঝে নিন!”

শুধু জেলা প্রশাসনই নয়, তৃণমূল জমানায় রাজ্য সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারীদের চরম লাচার দশাও প্রকাশ্য রাজপথে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন প্রাক্তন এই শীর্ষ আমলা। রাজীব সিনহার বিস্ফোরক দাবি— “তৎকালীন সরকারের আমলে রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব থেকে শুরু করে পুলিশের ডিজি— সবার হাত-পা বাঁধা ছিল। প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে হয়তো প্রতিদিন নিয়ম করে ফাইল চালাচালি ও আলোচনা হতো, কিন্তু বাস্তব ময়দানে ক্ষমতা প্রয়োগের বিন্দুমাত্র স্বাধীনতা তাঁদের ছিল না। সাংবিধানিক সমস্ত ক্ষমতা খাতায়-কলমে থাকা সত্ত্বেও শীর্ষ আমলাদের অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ অসহায়ের মতো!”

আদালতের নির্দেশে পঞ্চায়েত ভোটের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে গিয়ে যে প্রহসন তৈরি হয়েছিল, তার পর্দা টেনে ছিঁড়ে রাজীব সিনহা জানিয়েছেন— কলকাতা হাইকোর্টের কড়া নির্দেশে তিনি নিজে অন্তত ২০০টি মামলার শুনানি করেছিলেন। শুনানিতে বিরোধী ও সাধারণ অভিযোগকারীদের নিদারুণ কান্নাকাটি ও অত্যাচারের বিবরণ শুনে খারাপ লাগলেও তাঁর হাত ছিল পুরোপুরি অচল। কারণ জেলা থেকে ডিএম ও এসপি-রা রাজনৈতিক প্রভুদের বাঁচাতে আগে থেকেই মিথ্যা ক্লিনচিট রিপোর্ট পাঠিয়ে দিতেন। আর যখনই কোনো স্পর্শকাতর বুথ বা গণনাকেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ চেয়ে পাঠানো হতো, তখনই প্রশাসন থেকে অজুহাত দেওয়া হতো যে ফুটেজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাজীব সিনহা ব্যঙ্গের সুরে তাঁদের বলতেন— ক্যামেরা যদি হারিয়েই গিয়ে থাকে, তবে থানায় এফআইআর করুন!

নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্র ও পুলিশ প্রশাসন— সমগ্র ব্যবস্থাকে কবজায় রেখে কীভাবে ২০২৩-এর পঞ্চায়েত ভোট নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল, রাজীব সিনহার এই স্বীকারোক্তি তারই জলজ্যান্ত দলিল হয়ে সামনে এল। যে অভিযোগ বিরোধীরা দিনের পর দিন রাজপথে রক্ত দিয়ে জানিয়ে আসছিল, আজ খোদ তৎকালীন নির্বাচন কমিশনারের মুখ থেকেই সেই সত্য বেরিয়ে আসায় তৃণমূলের বিগত জমানার তথাকথিত নির্বাচনী জয়ের ভিত্তি ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *