রাজ্যজুড়ে সাংগঠনিক ভিতকে আরও নিশ্ছিদ্র, আগ্রাসী এবং শক্তিশালী করতে এবার রাজ্য কমিটিতে এক অভূতপূর্ব ও ব্যাপক রদবদল ঘটাল ভারতীয় জনতা পার্টি! বিধানসভা ও বিভিন্ন উপনির্বাচনের গতিপ্রকৃতি সামনে রেখে এবার একেবারে বুথস্তর থেকে শুরু করে রাজ্য নেতৃত্বের শীর্ষে আনা হলো একাধিক নতুন ও লড়াকু মুখ। দলের অন্দরে কাজের গতি বাড়াতে একদিকে যেমন ৭টি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক জেলায় একযোগে নতুন সভাপতি নিয়োগ করা হয়েছে, তেমনই বিভিন্ন মোর্চা ও রাজ্য কমিটির ক্ষেত্রেও কার্যকর করা হয়েছে সুনির্দিষ্ট রদবদলের রূপরেখা।
রাজ্য বিজেপির পদাধিকারী তালিকায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সাধারণ সম্পাদক পদে। নিয়ম অনুযায়ী পাঁচজন সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে বাপি গোস্বামীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাঁর জায়গায় নতুন সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে অভিজ্ঞ নেতা বিজন গোস্বামীকে। তবে লকেট চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো, ইন্দ্রনীল খাঁ এবং শশী অগ্নিহোত্রী— এই চার শীর্ষ মুখ নিজেদের সাধারণ সম্পাদক পদেই বহাল থেকেছেন।
বিজেপির সুনির্দিষ্ট ও কড়া নীতি ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ কঠোরভাবে কার্যকর করতে এবার রাজ্য সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকা নেতাদের সাংগঠনিক কমিটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি কাজের ব্যস্ততার কারণে তাঁরা যাতে সংগঠনে অতিরিক্ত চাপে না পড়েন, সেই ভারসাম্য বজায় রেখেই নতুন করে ৫ জন সহ-সভাপতি এবং ৪ জন নতুন সম্পাদককে রাজ্য কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দার্জিলিঙের সাংসদ তথা সিকিমের ইনচার্জ রাজু বিস্তার কাঁধে রাজ্য সহ-সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণের সমন্বয়কে আরও জোরদার করা হলো।
সবচেয়ে নজরকাড়া চমক দেখা গিয়েছে দলের বিভিন্ন ফ্রন্ট বা মোর্চার নেতৃত্বে। মহিলা মোর্চার রাজ্য সভানেত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে স্পষ্টবক্তা ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী অঞ্জনা বসুকে। অন্যদিকে রাজ্যের যুবসমাজকে সংগঠিত করতে ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার রাজ্য সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে আমতার বিজেপি বিধায়ক অমিত সামন্তর হাতে। ওবিসি মোর্চার দায়িত্ব এতদিন সামলানো অজিত দাসকে রাজ্য সম্পাদকের দায়িত্বে এনে ওবিসি মোর্চার রাজ্য সভাপতির পদে বসানো হয়েছে ধনঞ্জয় ঘোষকে। এসসি মোর্চার শীর্ষ নেতৃত্বে আনা হয়েছে বিশ্বজিৎ বিশ্বাসকে, এবং একই সাথে ফলতার দলীয় বিধায়ককে দেওয়া হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা বিভাগের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকার সাংগঠনিক দায়িত্ব।
শুধু রাজ্য দফতরই নয়, সাংগঠনিক জেলাগুলির রাশও এবার তুলে দেওয়া হয়েছে নতুন নেতৃত্বের হাতে। একসঙ্গে ৭টি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় এসেছে নতুন জেলা সভাপতি—
* বারাসাতে রাজীব পোদ্দারের জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দীপঙ্কর চক্রবর্তীকে;
* বনগাঁয় বিকাশ ঘোষের পরিবর্তে আনা হয়েছে নৃপেন বিশ্বাসকে;
* শ্রীরামপুরে সুমন ঘোষের জায়গায় দায়িত্ব সামলাবেন শশী সিং;
* আরামবাগে সুশান্ত বেরার জায়গায় দলীয় সভাপতি করা হয়েছে বিধায়ক প্রশান্ত দিগারকে;
* মেদিনীপুরে শমিত কুমার মণ্ডলের জায়গায় এলেন সৌমেন তিওয়ারি;
* বর্ধমানে অভিজিৎ তায়ের বদলে দায়িত্ব পেয়েছেন আশিস পাল;
* এবং কাটোয়ায় স্মৃতিকণা বসুর জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে মানিক রায়কে।
সংগঠনে নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে নতুন রক্ত সঞ্চালন করা এবং ২০২৬-এর পরবর্তী রাজনৈতিক লড়াইয়ে সংগঠনকে একশো শতাংশ প্রস্তুত রাখাই যে এই ব্যাপক পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য, রাজ্য বিজেপির এই নয়া কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়ে গেল।