মাঝআকাশে প্রায় ৩৫ হাজার ফুট উঁচুতে উড়ছিল বিমান। গন্তব্য ছিল ইজরায়েলের তেল আভিভ। ঠিক তখনই ককপিটের ভেতরে ঘটে গেল এমন এক নারকীয় ও রোমহর্ষক ঘটনা, যা মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছিল ২০০১ সালের আমেরিকার ৯/১১-এর সেই কুখ্যাত বিমান হামলার ভয়ঙ্কর স্মৃতি! যদি সেদিন চালকের আসনে এক নির্ভীক, ইস্পাত-কঠিন মনোবলের ভারতীয় পাইলট না থাকতেন, তবে হয়তো আরও একবার সাক্ষী হতে হতো শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার। বিমানে থাকা ১৭৪ জন নিরীহ যাত্রীর নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে এনে বিশ্বজুড়ে আজ প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন ভারতের বীর সন্তান— ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর!
ঘটনাটি ঘটে বুধবার সকালে। ‘ফ্লাই দুবাই’-এর এফজেড ১০৭৩ উড়ানটি দুবাই বিমানবন্দর থেকে তেল আভিভের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। প্রধান চালকের আসনে দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন গুজরাটের সন্তান ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। কিন্তু উড়ান চলাকালীন হঠাৎই ককপিটের ভেতরে চরম অপ্রকৃতিস্থ ও হিংস্র আচরণ শুরু করেন সহ-পাইলট। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি ধারালো ছুরি নিয়ে ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি! এলোপাথাড়ি কোপানো হতে থাকে ভারতীয় ক্যাপ্টেনকে। রক্তে ভেসে যায় পুরো ককপিট। নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে বিমানটি মাত্র দু’মিনিটের ব্যবধানে হু-হু করে নেমে আসে প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ ফুট নিচে! গোটা বিমানের ভেতরে তখন চরম আতঙ্ক আর নিশ্চিত মৃত্যুর হাহাকার।
কিন্তু গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায়ও নিজের কর্তব্য এবং যাত্রীদের জীবন রক্ষার দায়িত্ব থেকে এক চুলও নড়েননি ক্যাপ্টেন স্মিত। শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তিনি ককপিটের দখল ধরে রাখেন এবং অন্যান্য ক্রু সদস্যদের সহযোগিতায় আক্রমণকারী সহ-পাইলটকে নিরস্ত্র ও কাবু করতে সক্ষম হন। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে, অবিশ্বাস্য দক্ষতায় বিমানটিকে স্থিতিশীল করে সৌদির উত্তর-পশ্চিমের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে জরুরি অবতরণ করান তিনি। রক্ষা পায় ১৭৪ জন যাত্রী এবং বিমানের প্রতিটি কর্মীর অমূল্য প্রাণ!
ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের এই অতুলনীয় বীরত্বে আজ গর্বিত সমগ্র ভারত তথা আন্তর্জাতিক মহল। প্রায় ১৩ বছর ধরে বিমান চালানোর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই অভিজ্ঞ বৈমানিক টানা ১০ বছর কাজ করেছেন ‘স্পাইসজেট’-এ। পরবর্তীতে ২০২২ সালে যোগ দেন ‘ফ্লাই দুবাই’-তে। দীর্ঘ ১০ হাজার ঘণ্টারও বেশি বিমান চালানোর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ক্যাপ্টেন স্মিতের এই অসীম সাহসকে কুর্নিশ জানিয়ে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেল ঘোষণা করেছেন— গুজরাটের এই বীর সন্তানকে রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান ‘গুজরাট গরিমা পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী এক্স হ্যান্ডলে লেখেন— “ইজরায়েলগামী বিমানের পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের সাহসিকতাকে আজ সারা বিশ্ব কুর্নিশ জানাচ্ছে। রক্তাক্ত হওয়া সত্ত্বেও ১৭৪ জন যাত্রীর জীবন রক্ষায় তাঁর এই আত্মত্যাগ দেশবাসীর কাছে অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক।” শুধু ভারতেই নয়, তেল আভিভগামী বিমানের যাত্রীদের জীবন রক্ষা করার এই অসীম মানবিকতাকে পূর্ণ মর্যাদা দিতে ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মানে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইজরায়েল সরকারও। মাঝআকাশের নারকীয় মৃত্যুর খাঁচা থেকে যেভাবে নিজের রক্ত ঝরিয়ে শত শত পরিবারকে রক্ষা করলেন এই ভারতীয় পাইলট, তা পৃথিবীর বিমান চলাচলের ইতিহাসে এক অনন্য স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে!