নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের মহারণে ভোটের সকালে আছড়ে পড়ল এক অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক ভূকম্পন! ভোটব্যাংকের রাজনীতি, তৃণমূলের দলীয় অনুশাসন আর সংকীর্ণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সমস্ত পাঁচিল ভেঙে চুরমার করে দিয়ে খাস মমমাপন্থী তৃণমূল নেতার পরিবার থেকেই আশীর্বাদ আর মাতৃস্নেহ উপচে পড়ল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জন্য! একদিকে যখন তৃণমূলের নেতারা দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে কিংবা টিভিতে বসে নানা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব সাজাচ্ছেন, ঠিক তখনই নন্দীগ্রামের মাটিতে স্বয়ং তৃণমূলের একদা দাপুটে নেতা আবু তাহেরের বৃদ্ধা মা ক্যামেরার সামনে বুক ফুলিয়ে ঘোষণা করলেন— “শুভেন্দু আমার বড় ছেলে! ও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে বলে কি মা ডাক মুছে যাবে? আমার শুভেন্দুই জিতবে, ও মানুষের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ করছে!”
মঙ্গলবার উপনির্বাচনের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে নন্দীগ্রামের বুথে পৌঁছেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আর সেখানেই সাংবাদিকরা আবু তাহেরের অশীতিপর বৃদ্ধা মায়ের মুখোমুখি হতেই বেরিয়ে আসে রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা এক অটুট পারিবারিক ও আত্মিক বন্ধনের গল্প। সাংবাদিকরা যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন— ‘শুভেন্দুবাবু আপনার কে হন?’ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হাসিমুখে সেই প্রবীণা উত্তর দেন— “শুভেন্দু আমার বড় ছেলে।” শুভেন্দু অধিকারী এখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, সেই কথা মনে করিয়ে দিতেই বৃদ্ধার অকপট ও হৃদয়স্পর্শী প্রত্যুত্তর— “শুনেছি, সব শুনেছি। এখন তো আর অত দেখা হয় না, দেখা হলে আরও খুশি হব। তবে উনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন তাতে কী হয়েছে? মুখ্যমন্ত্রী হলে কি রক্তের চেয়েও আপন সেই ‘মা’ ডাক কখনো মুছে যেতে পারে? আগে তো প্রায়ই শুভেন্দু আমাদের বাড়িতে আসত, আমায় মা বলে জড়িয়ে ধরত।”
ঈশ্বরের কাছে হাত তুলে শুভেন্দুর সার্বিক সাফল্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে তাহেরের মা স্পষ্ট বলেন— “আমার বড় ছেলে খুব ভালো কাজ করছে। এই নির্বাচনে বড় ছেলে শুভেন্দুই জিতবে!” তৃণমূলের প্রাক্তন একচ্ছত্র সেনাপতির বাড়ি থেকে এই আবেগঘন বার্তা স্বাভাবিকভাবেই কালীঘাটের শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে দিয়েছে।
তবে এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত নয়। ভোটের ঠিক দু’দিন আগে, রবিবার যখন নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের শেষ প্রচার করছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, তখনই রাজপথে তৈরি হয়েছিল আর এক নজিরবিহীন দৃশ্য। খোদ আবু তাহেরের স্ত্রী আনিশা খাতুন এবং পুত্র ওয়াশিম রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছিলেন শুভেন্দুকে একনজর দেখার জন্য। গাড়ি পৌঁছাতেই শুভেন্দুর মাথায় ফুল দিয়ে আশীর্বাদ করেন আনিশা খাতুন, কুশল বিনিময় করেন ছেলে ওয়াশিমও। পালটা হাতজোড় করে তাঁদের পরিবারের মঙ্গলকামনা করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এর পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটভূমিও। এর আগেই তৃণমূল নেতৃত্ব, বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আই-প্যাকের বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক তোপ দেগেছিলেন আবু তাহের স্বয়ং। তিনি ফাঁস করেছিলেন— মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন খোদ মমতাই তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখে বলেছিলেন, “তুই তো শুভেন্দুর বন্ধু!” শুধু তাই নয়, তৃণমূল নেতৃত্বের ঔদ্ধত্যের সমালোচনা করে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীকে ১০০-র মধ্যে ৯৯ নম্বর দিয়েছিলেন এই দাপুটে নেতা।
আজ ভোটের দিন নন্দীগ্রামের মাটিতে সেই পরিবারের মা, স্ত্রী ও পুত্রের এমন অকুণ্ঠ ভালোবাসা আর প্রকাশ্য আশীর্বাদ স্পষ্ট প্রমাণ করে দিল— নন্দীগ্রামের মাটিতে শুভেন্দু অধিকারীর সম্পর্ক কোনো কৃত্রিম রাজনৈতিক পদের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এই সম্পর্ক মাটির, এই সম্পর্ক হৃদয়ের। আর সেই আত্মিক টানের সামনে দাঁড়িয়ে বিরোধী শিবিরের যাবতীয় প্রচার ও কুৎসা যে ভোটের লাইনেই ভেসে গিয়েছে, আবু তাহেরের মায়ের এই স্নেহাশিসই তার জীবন্ত প্রমাণ!