রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামোয় এক ঐতিহাসিক ও আমূল পরিবর্তনের সূচনা করল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার! দীর্ঘদিন ধরে যে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে ঘিরে নিয়োগে অস্বচ্ছতা, স্বজনপোষণ এবং দুর্নীতির পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ উঠছিল, সেই পৃথক ব্যবস্থার এবার স্থায়ী অবসান ঘটাল নবান্ন। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করে দিলেন— পশ্চিমবঙ্গে আর কোনো অস্তিত্ব থাকছে না মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের! পৃথক এই সংস্থাকে পুরোপুরি অবলুপ্ত করে সরাসরি যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন বা এসএসসি-র সঙ্গে।
মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন— “মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন তুলে দেওয়া হয়েছে। ওটাকে স্কুল সার্ভিস কমিশনের সাথে পুরোপুরি মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।” এর অর্থ, রাজ্যের অন্যান্য সাধারণ সরকারি ও সরকার-পোষিত বিদ্যালয়ের মতো এবার থেকে মাদ্রাসাগুলির শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগও সম্পন্ন হবে একক ও অভিন্ন স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য— নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গতি আনা এবং দীর্ঘদিনের জটিলতা ও অস্বচ্ছতা সমূলে বিনাশ করা। বিগত সরকারের আমলে সাধারণ স্কুলের মতোই মাদ্রাসার নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ ও বেনিয়মের ভুরি ভুরি অভিযোগ সামনে এসেছিল। নতুন সরকার সেই দ্বৈত নীতি আর বজায় রাখতে নারাজ; গোটা রাজ্যে মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও অভিন্ন নিয়মেই হবে শিক্ষক বাছাই।
তবে শিক্ষায় এই কাঠামোগত শুদ্ধিকরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেই সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করে সরাসরি রাজ্য উচ্চশিক্ষা দফতরের অধীনে আনা হয়েছে। উচ্চশিক্ষার মূল স্রোতে সামিল করতেই আলিয়ার এই প্রশাসনিক হস্তান্তর করা হয়েছিল।
আর এবার নজরে এসেছে অনুমোদনহীন ও বেআইনি মাদ্রাসার রমরমা। বিগত মাসেই রাজ্যের মোট ২৫২টি মাদ্রাসাকে অবিলম্বে বন্ধ করার কড়া নোটিস জারি করেছে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি আরও ১০০টি মাদ্রাসাকে শোকজ করা হয়েছে। বন্ধের তালিকায় থাকা ২৫২টি মাদ্রাসার সিংহভাগই তথাকথিত খারিজি মাদ্রাসা, যেখানে সরকারি পাঠ্যক্রমের কোনো বালাই ছিল না। কলকাতা সহ সমগ্র রাজ্যজুড়ে গত ২২শে জুলাই সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর যে ম্যারাথন সমীক্ষা চালিয়েছিল, তার রিপোর্ট ছিল রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো! সেই সমীক্ষায় দেখা যায়— রাজ্যের প্রায় ২ হাজার ৩৯৬টি মাদ্রাসার ন্যূনতম কোনো সরকারি অনুমোদনই নেই!
ভুয়ো অনুমোদন আর অসঙ্গতির আড়ালে গড়ে ওঠা সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থাকে আইনের আওতায় আনতে বর্তমান প্রশাসনের এই কড়া পদক্ষেপ এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত। একদিকে বেআইনি খারিজি মাদ্রাসার ওপর প্রশাসনিক রাশ, আর অন্যদিকে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে এসএসসি-র অন্তর্ভুক্ত করে দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগের সংকল্প— শুভেন্দু অধিকারীর এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট বার্তা দিল যে, শিক্ষার আঙিনায় কোনো বিশেষ তোষণ নয়, মেধা আর নিয়মের শাসনই হবে শেষ কথা!