অত্যন্ত বিস্ফোরক ও সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক দাবি তুলে গোটা দেশের রাজনীতিতে তীব্র শোরগোল ফেলে দিলেন বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে! তাঁর সরাসরি বক্তব্য— ভারতের লক্ষ্য শুধু পাক অধিকৃত কাশ্মীর মুক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বরং স্বাধীনতার সময় তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ভুলে যে সমস্ত ভূখণ্ড তৎকালীন পাকিস্তানের হাতে চলে গিয়েছিল, সেই সমস্ত এলাকাও ভারতের ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসে গিয়েছে। আর এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত অত্যন্ত কৌশলগত এলাকা— ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম বন্দর, সিলেট এবং নোয়াখালি! বিজেপি সাংসদের এই দাবি প্রকাশ্যে আসতেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
নেহরুর ভূমিকা ও স্বাধীনতার সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে নিশিকান্ত দুবে দাবি করেন— জওহরলাল নেহরু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য এতটাই মরিয়া ছিলেন যে দেশের অখণ্ডতার প্রশ্নে একাধিক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত পূর্ণ স্বাধীনতা পেলেও, অন্তর্বর্তী সরকারের অংশ হিসেবে নেহরু ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বরই কার্যত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আর ঠিক তার দেড় মাসের মাথায়, ১৯৪৬ সালের ১৫ অক্টোবর নোয়াখালির বুকে সনাতনী হিন্দুদের ওপর নেমে এসেছিল মধ্যযুগীয় নারকীয় গণহত্যা। বিজেপি সাংসদের অভিযোগ— এক দিনেই প্রায় ১০ হাজার নিরীহ হিন্দুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, অথচ তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নেহরু একবারও ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাননি। হিন্দুদের রক্ষার চেয়ে মুসলিম লিগকে কীভাবে সরকারের সাথে যুক্ত রাখা যায়, সেই রাজনৈতিক অঙ্কেই তিনি বেশি ব্যস্ত ছিলেন বলে অভিযোগ তোলেন দুবে।
এরপরই এক চাঞ্চল্যকর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন বিজেপি সাংসদ। তিনি দাবি করেন— নোয়াখালি, সিলেট এবং চট্টগ্রাম বন্দর একসময় ত্রিপুরা দেশীয় রাজ্যের অর্থাৎ তৎকালীন ‘ত্রিপ্রা’র ঐতিহাসিক অংশ ছিল। সেই সময় ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম সিং নেহরুর কাছে এই সংবেদনশীল এলাকাগুলির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ নিয়ে সুস্পষ্ট প্রস্তাব রেখেছিলেন। রাজার যুক্তি ছিল, সিলেট ও চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে গণভোটের ব্যবস্থা করা হোক, যাতে ওই অঞ্চলের জনগণ ঠিক করতে পারেন তাঁরা ভারতের সঙ্গে থাকবেন, পাকিস্তানে যাবেন, নাকি স্বতন্ত্র থাকবেন। কিন্তু তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের গাফিলতিতে সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীতে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের সক্রিয় হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয় এবং ১৯৪৮ সালের অক্টোবর মাসে মহারাণী কাঞ্চন প্রভা ভারতভুক্তির চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করায় ত্রিপুরা ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
ঐতিহাসিক ক্ষোভের পাশাপাশি বর্তমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়টিকেও সামনে এনেছেন নিশিকান্ত দুবে। তাঁর স্পষ্ট দাবি— চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের হাতে না থাকাটাই বিগত সাত দশকে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির অনগ্রসরতা ও বিচ্ছিন্নতার অন্যতম প্রধান কারণ। ভারতভাগের ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সমুদ্রপথের সরাসরি বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। যার ফলস্বরূপ উত্তর-পূর্বের বিপুল খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও বনায়ন সম্পদের মতো প্রাকৃতিক সম্ভাবনাকে দেশীয় অর্থনীতির সাথে পুরোপুরি যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই ঐতিহাসিক ক্ষত ও ভূ-রাজনৈতিক ভুল সংশোধন করতেই PoK-এর পাশাপাশি নোয়াখালি, সিলেট ও চট্টগ্রাম বন্দরকে ফেরত নেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেন তিনি।
পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর থেকে শুরু করে প্রতিবেশী বাংলাদেশের একাধিক কৌশলগত অঞ্চলকে ভারতের মানচিত্রে ফেরানোর এই দাবি— নিশিকান্ত দুবের এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে কূটনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্কের পারদ যে চরম সীমায় পৌঁছাল, তা বলাই বাহুল্য