রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হতে চলেছে বাংলা! রাজনৈতিক পালাবদলের পর এবার রাজ্যের বিদ্যালয় স্তরের পাঠ্যক্রমে ব্যাপক রদবদল আনতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পূর্বতন সরকারের আমলে পাঠ্যবইয়ে স্থান পাওয়া একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অধ্যায় এবার ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বই থেকে চিরতরে বাদ পড়তে চলেছে বহুল চর্চিত ‘সিঙ্গুর জমি আন্দোলন’-এর অধ্যায়। একই সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে বাদ যাচ্ছে বিগত সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘কন্যাশ্রী’-র বিবরণ। তার বদলে নতুন পাঠ্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা তথা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও রাষ্ট্রগঠনে তাঁর অবদানের ইতিহাস। সম্প্রতি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন।
শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন— সংশোধিত পাঠ্যক্রমে পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং রাজ্যের বিশিষ্ট মণীষীদের ওপর অনেক বেশি জোর দেওয়া হবে। রাজনৈতিক প্রচারমূলক অধ্যায়গুলোকে সরিয়ে শিক্ষাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য। সেই পরিকল্পনা মাফিকই এবার থেকে প্রতিটি শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও জাতীয় ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ও প্রামাণ্য পরিচিতি তুলে ধরা হবে। অন্যদিকে, এতদিন অষ্টম শ্রেণিতে সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের যে বিতর্কিত অধ্যায় পড়ানো হতো, নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে তা আর থাকবে না। ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যবই থেকেও কন্যাশ্রী সংক্রান্ত প্রকল্প-ভিত্তিক আলোচনা সরিয়ে ফেলার সুপারিশ চূড়ান্ত হয়েছে।
তবে শুধু ঐতিহাসিক অধ্যায়ের বদলই নয়, সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করে তুলতে একগুচ্ছ পরিকাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন জানিয়েছেন— পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ‘ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি’ বা আইসিটিকে (ICT) একটি নির্দিষ্ট সিলেবাস সহ পৃথক বিষয় হিসেবে চালু করা হবে। এর পাশাপাশি সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য চালু হচ্ছে তৃতীয় ভাষার নতুন পাঠ্যবই। জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করতে প্রতিটি পাঠ্যবইয়ের শুরুর পাতায় সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ গানটি ছাপা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি সরকারি স্কুলের বইয়ের কাগজের গুণমানও উন্নত করা হয়েছে বলে দপ্তর সূত্রে দাবি।
শিক্ষানীতিতে আরও একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। নবম শ্রেণি পর্যন্ত চালু থাকা বহুল বিতর্কিত ‘নো-ডিটেনশন’ নীতি অর্থাৎ পাস-ফেল প্রথা না রাখার নিয়মটি তুলে দেওয়া নিয়ে সরকার সক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা করছে। পড়াশোনার মান ধরে রাখতে এই নীতি বাতিলের বিষয়ে খুব শীঘ্রই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষিত হতে পারে।
এদিকে পাঠ্যক্রম বদলের সমান্তরালেই ২০২৭ সালের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে তৈরি হয়েছে এক বড়সড় জটিলতা। জানা গিয়েছে, ২০২৭ সালের শুরুর দিকে দেশজুড়ে জনগণনার কাজ চলার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। আর সেই জনগণনার ফিল্ড ওয়ার্কে বিপুল সংখ্যক স্কুলশিক্ষককে আবশ্যিকভাবে নিয়োগ করতে হবে। শিক্ষকদের এই দায়িত্ব এবং বোর্ডের পরীক্ষা যাতে মুখোমুখি সংঘর্ষে না পড়ে, সেই কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের দিনক্ষণ পিছিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে নবান্ন।
ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ প্রস্তাব দিয়েছে— ২০২৭ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষা ১৫ ফেব্রুয়ারির বদলে ২ মার্চ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হোক। অন্যদিকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদও তাদের চতুর্থ সেমেস্টারের পরীক্ষা ১৬ মার্চের পর শুরু করার বিষয়ে প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, দুই পর্ষদের প্রস্তাবই সরকারের টেবিলে জমা পড়েছে এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যেই পরীক্ষার এই সংশোধিত সময়সূচি সরকারিভাবে ঘোষণা করা হবে।
সিলেবাসে শ্যামাপ্রসাদের অন্তর্ভুক্তি, সিঙ্গুর আন্দোলনের বিদায় এবং পাস-ফেল নীতি পুনর্বিবেচনার এই মেগা সিদ্ধান্ত বাংলার শিক্ষা পরিকাঠামোকে এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিল!