মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র ভবানীপুর এবারের নির্বাচনে পাখির চোখ হয়ে উঠেছে। কারণ ভোটের প্রার্থী হিসেবে একদিকে রয়েছেন খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো আর অন্যদিকে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। ফলে এই দুইয়ের ভোটের লড়াইয়ে ফলাফল কি হয়, সে দিকে তাকিয়ে এখন সকলেই। এদিকে এমতাবস্থায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে ফের বিপাকে ফেলে দিয়েছেন সাংসদ মহুয়া মৈত্র। কারণ এবার খাস কলকাতায় গুজরাটি বিতর্কের ঝড় উঠেছে। আর এই আবহেই বিরোধী শিবির এক প্রকার শাসক দলের ঘাড়ে চেপে বসেছে। যার জেরে তৃণমূলের অন্দরে বেড়েছে অস্বস্তি।
এদিন এক্স হ্যান্ডেলে মহুয়া মৈত্র-র একটি ভিডিও সামনে এসেছে। যেখানে তাকে বলতে শোনা গিয়েছে, স্বাধীনতার লড়াইয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বাঙালিরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু গুজরাটি কজন ছিলেন? আপনি কালাপানিতে গেলে কাদের নাম দেখতে পাবেন? আপনাদের বড় হিরো বীর সাভারকার ছাড়া আর একজনও গুজরাটির নাম বলতে পারবেন, যিনি ওখানে ছিলেন? এমনকি, বীর সাভারকার ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন, সে কথাও তুলে ধরেন তিনি। ব্যস, এরপরই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় জোর চর্চা। যদিও তৃণমূল এই পরিস্থিতি বেশ দ্রুত সামাল দিতে চাইছে, তা বোঝাই যাচ্ছে। আর সে কারণেই তো এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে তড়িঘড়ি ক্ষমা চেয়ে নেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
না, এটুকুতেই ক্ষান্ত হয়নি তৃণমূল! বরং, দলের কাউন্সিলর অসীম বসু-র মাধ্যমে সরাসরি গুজরাটি সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে মমতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। আসলে ভবানীপুরের ৭০ নম্বর ওয়ার্ডে গুজরাটি সম্প্রদায়ের বেশি বাস। ফলত, তারা যে এ কথা ভালোভাবে নেননি তা বেশ স্পষ্ট শাসক দলের কাছে। আর তাই তড়িঘড়ি এহেন পদক্ষেপ। এদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় অসীম বসু মুখ্যমন্ত্রীর লেখা একটি চিঠিও পড়ে শোনান। তাতে লেখা ছিল, তিনি গুজরাটি ভাই-বোনেদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন। পাশাপাশি তিনি এও জানান, এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কোনো মন্তব্য দল সমর্থন করে না এবং ইতিমধ্যেই এই বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সাংসদের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে।
তবে, এত বড়ো ইস্যুতে চুপ থাকেননি নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী। তিনিও চলতি সপ্তাহের বুধবার এক্স মাধ্যমে একটি গুজরাটি ভাষায় পোস্ট করেছেন। যেখানে তিনি লিখেছেন, তৃণমূলের সংস্কৃতি-ই হল সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিকল্পিত বিভাজন সৃষ্টি করা ও ঘৃণা ছড়ানো। এরপরই মহুয়া মৈত্রকে উল্লেখ করে তিনি লেখেন, তৃণমূলের ওই সাংসদ শুধু গুজরাটি সমাজকেই অপমান করেননি, তিনি ভারতের আত্মাকেও অপমান করেছেন। তার কথায়, স্বাধীনতা সংগ্রামে গুজরাটিদের অবদান নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে কোনো একটি রাজ্য বা সম্প্রদায়ের অপমান নয়। এটি মহাত্মা গান্ধী ও লৌহ মানব সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হানা। তিনি আরও জানান যে, তাদের দল তথা বিজেপি বাঙালি, পাঞ্জাবি, বিহারী, মাড়োয়ারি—সকলকেই সমান চোখে দেখে। কিন্তু তৃণমূল সবেতেই বিভাজন খুঁজে পায়।
যদিও রাজনীতিবিদদের এমন গুজরাটি প্রেমী হয়ে ওঠার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞ মহলে বেশ কিছু দাবি করেছে। তাদের মতে, বিরোধীদের এহানো বিতর্ক সৃষ্টির অন্যতম কারণ ভবানীপুর কেন্দ্রের জনবিন্যাস। আসলে এই কেন্দ্রে বাঙালি হিন্দু, অ-বাঙালি হিন্দু, মুসলিম, শিখ, জৈন-সহ বহু সম্প্রদায় ও ভাষা-ভাষির মানুষের বাস। ফলত, কোনো সম্প্রদায়কে-ই রাগাতে চায় না গেরুয়া শিবির। জনসংখ্যা পরিসংখ্যান বলছে, ভবানীপুর কেন্দ্রে ৪২% বাঙালি হিন্দু ভোটার, ৩৪% অ-বাঙালি হিন্দু ভোটার ও ২০% মুসলিম ভোটার রয়েছে। যার মধ্যে ৭০ ও ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের ৪০% ভোটারই গুজরাটি। এমনকি ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের ওয়ার্ড ভিত্তিক ফলাফলে চোখ রাখলে দেখা যাবে, ৭০ নম্বর ওয়ার্ডে ৩,৮৬৫ ভোটে এবং ৭১ নম্বর ওয়ার্ডে ১ হাজার ভোটে বিজেপি এগিয়েছিল। তবে, এবারের নির্বাচনে সেই ফল বাড়ে নাকি কমে, এখন সেটাই দেখার।