এপ্রিলেই হবে ভোট যুদ্ধ। ইতিমধ্যে সে দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। সব রাজনৈতিক দলগুলিও প্রায় তাদের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে দিয়েছে। আর এবার পালা ইশতেহার প্রকাশের। কলকাতায় অমিত শাহের হাত ধরে প্রকাশিত হয়েছে বিজেপি-র নির্বাচনী ইশতেহার। যদিও প্রথমে এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সংকল্প পত্র’। তবে, পরে এর নাম বদলে রাখা হয় ‘ভরসা পত্র’। আর এই ভরসা পত্রেই রয়েছে সাধারণ মানুষদের জন্য একের পর উপহার। এদিন দলের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে বিজেপি নেতা অমিত শাহ বলেন, ‘বাংলার প্রতিটি স্তরের মানুষের হতাশা থেকে মুক্তির পথ বিজেপি-র এই ইশতেহার। এটি যেমন কৃষকদের নতুন পথ দেখাবে, তেমনই এটি বেকার যুবক এবং মহিলাদেরও নতুন দিশা দেখাবে। তাদের এই সংকল্প বাংলার মানুষকে অন্ধকার রাত্রি থেকে মুক্ত করার বলেও দাবি করেন তিনি।
কী কী ঘোষণা রয়েছে বিজেপি-র ভরসা পত্রে?
* ইশতেহারের সবচেয়ে বড় চমক রয়েছে মহিলাদের জন্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বিজেপি ঘোষণা করেছে, তারা ক্ষমতায় এলে রাজ্যের প্রত্যেক যোগ্য মহিলাকে মাসে ৩০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে নার্সারি থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েশন পর্যন্ত মেয়েদের পড়াশোনা হবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং মহিলাদের নিরাপত্তায় তৈরি হবে বিশেষ ‘পিঙ্ক ফোর্স’। সেই সঙ্গে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের সংখ্যাও বাড়ানো হবে।
* অনুপ্রবেশে শুরু হবে ‘জ়িরো টলারেন্স’। ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট নীতির মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের বেছে বেছে রাজ্য থেকে বার করে দেশকে সুরক্ষিত করা হবে বলে উল্লেখ রয়েছে ইস্তেহার পত্রে। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজেপি অঙ্গীকার করেছে, বাংলায় তারা ক্ষমতায় এলে বর্ডার এলাকাগুলিতে এমন নিরাপত্তা বলয় তৈরি হবে যে ‘পাখিও গলতে পারবে না’।
* সমস্ত সরকারি শূন্যপদে স্বচ্ছতার সঙ্গে স্থায়ী নিয়োগ করার পাশাপাশি বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম পে কমিশন অনুযায়ী সরকারি কর্মীরা বেতন পাবেন। সেই সঙ্গে সকল সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের DA-ও সুনিশ্চিত করা হবে।
* ক্ষমতায় আসার ৬ মাসের মধ্যে তারা UCC বাস্তবায়ন করবেন বলেও জানিয়েছেন। যেখানে ধর্মীয় আইনের ঊর্ধ্বে উঠে সবার জন্য সমান নাগরিক বিধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, উত্তরাখণ্ডের পর পশ্চিমবঙ্গ হবে দ্বিতীয় রাজ্য, যেখানে ক্ষমতায় আসার ৬ মাসের মধ্যে UCC লাগু হবে।
* সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের দিয়ে কমিটি গড়ে তোলা হবে। যেখানে সকল রাজনৈতিক হিংসার তদন্তের জন্য দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে।
* ইশতেহারে বিজেপির অন্যতম বড় অস্ত্র ‘দুর্নীতি’। তারা ঘোষণা করেছে, গত ১০-১৫ বছরে তৃণমূলের জমানায় নিয়োগ দুর্নীতি বা অন্যান্য কেলেঙ্কারিতে যারা যুক্ত, তাদের জন্য গঠন করা হবে বিশেষ টাস্ক ফোর্স। লুটে নেওয়া টাকা সাধারণ মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আইনি ব্যবস্থা করা হবে।
* সিঙ্গুরে বিজনেস পার্ক তৈরি করা হবে এবং ৫০ শতাংশ জমি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কাজে লাগানো হবে বলেও লেখা হয়েছে ইস্তেহার পত্রে।
* দার্জিলিং-কে হেরিটেজ পর্যটনকেন্দ্র বানানো হবে। সেই সঙ্গে চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য বিশেষ বন্দোবস্ত করা হবে এবং চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের জন্য আধুনিক স্কুলের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
* পদ্ম শিবির ক্ষমতায় এলে বঙ্গবাসী আয়ুষ্মান ভারত-সহ কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। এমনকি। মহিলাদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ক্যানসার রোধের বন্দোবস্ত করা হবে বলেও জানা গিয়েছে।
* উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে AIIMS ও IIT তৈরির পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করতে নতুন সড়কপথের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে এই ইস্তেহারে। পাশাপাশি সঙ্গে উত্তরবঙ্গে নতুন ক্যান্সার হাসপাতাল ও স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বিজেপি তার ইস্তেহারে তাজপুরে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া, কালোবাজারি ও সিন্ডিকেট রাজ বন্ধ করে বাংলাকে রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলেও উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কলকাতা মেট্রোর সম্প্রসারণ করার কথাও উল্লেখ রয়েছে ইশতেহারে। চাষিদের জন্য বলা হয়েছে, ধান, আলু, আম চাষের জন্য কৃষকদের সঠিক মূল্য দিতে নতুন প্রকল্প আনা হবে। যেখানে ধান কেনার জন্য কুইন্টাল প্রতি ৩১০০ টাকা হিসেবে দেওয়া হবে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের অর্থব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে কয়লা, বালি পাচারের অবসান ঘটবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন শাহ। সেই সঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের মুখে বাংলার নারীশক্তিকে হাতিয়ার করে একগুচ্ছ বৈপ্লবিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যের সমস্ত সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩% আসন সংরক্ষিত থাকবে।
এই ইশতেহার থেকে জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গকে ‘ব্লু ইকোনমি’র প্রধান রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত করার পাশাপাশি চারটি নতুন উপনগরী বা স্যাটেলাইট টাউনশিপ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টির। সীমান্তে অনুপ্রবেশ রুখতে BSF-কে জমি দেওয়া এবং গরু পাচার বন্ধ করার মাধ্যমে বাংলাকে এক নতুন দিশা দেখানোর কথাও জানানো হয়েছে। তবে, বিজেপি যে ইশতেহার বা ‘সংকল্প পত্র’ প্রকাশ করেছে, তা নিঃসন্দেহে আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলেই দাবি করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের দাবি, মাসে ৩০০০ টাকার ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ হোক বা ৬ মাসের মধ্যে UCC কার্যকর করা—এই ঘোষণাগুলি বাস্তবে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু এই বিশাল অঙ্কের টাকা রাজকোষের ওপর কতটা চাপ ফেলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যে DA-এর বকেয়া মেটানোর দাবিতে সরকারি কর্মচারীরা সরব, সেই সামর্থ্য আদৌ নতুন রাজ্য সরকার পাবে কিনা তাও এক চিন্তার বিষয়। তাছাড়া, ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার হলে অর্থের অভাব হবে না, বিজেপির এই দাবিতে বাংলার সচেতন ভোটাররা কতটা আস্থা রাখবে তা সবচেয়ে বড়ো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
না, শাসক দল কিন্তু এক্ষেত্রেও হাত গুটিয়ে বসে নেই। কারণ বিজেপির এই ৩০০০ টাকার ভাতা-র পাল্টা হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামীতে যে কোনো সময় একটি বড় চমক দিতেই পারেন। কারণ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার যখন শুরু হয়েছিল, তখন বিরোধীরা একে ‘ভিক্ষা’ বলেছিল, কিন্তু সেই স্কিমই গত নির্বাচনে তৃণমূলকে ক্ষমতায় ফেরাতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। আবার গেরুয়া শিবিরও সেই একই পথ অবলম্বন করছে। অর্থাৎ, লড়াইটা এখন ‘উন্নয়ন বনাম উন্নয়ন’ থেকে সরে এসে দাঁড়িয়েছে ‘প্রতিশ্রুতি বনাম প্রতিশ্রুতির’ যুদ্ধে। এদিকে মুসলিম ও মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক—এই দুইয়ের মেরুকরণ ইশতেহারের পর আরও স্পষ্ট হবে কিনা, তাও এখন দেখার। যদিও ইশতেহার হল দলগুলির একটি প্রতিশ্রুতির দলিল। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটাররা-ই। তাই ভোট কেবল ৩০০০ টাকার মোহেই পড়বে? নাকি বিচার হবে গত কয়েক বছরের পারফরম্যান্স আর আগামীর স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে? তা তো আগামী ৪ঠা মে জানা যাবে!