নির্বাচন মানেই উৎসব, কিন্তু সেই উৎসবে যদি কারচুপির ছায়া পড়ে যায়, তাহলেই অঘটন নিশ্চিত। তাই বুথের ভেতরে ‘তৃতীয় চোখ’ মানে ওয়েব ক্যামেরা ইনস্টল করার নির্দেশ অনেক আগেই দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। কিন্তু হঠাৎ-ই যদি ভোট চলাকালীন কোনো বুথে ওয়েব ক্যামেরা বিকল হয়ে যায়, তাহলে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে? এবার সে বিষয়েই খোলাখুলি আলোচনা করলো নির্বাচন কমিশন। আসলে অনেক সময় অভিযোগ উঠেছে, বুথে ছাপ্পা ভোট দিতে রাজনৈতিক দলের মদতপুষ্ট ‘দাদা’রা ওয়েবক্যামে চুইংগাম আটকে ক্যামেরা বিকল করে দেয়। এমনকি, অনেক সময় লোডশেডিং বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমস্যায় ওয়েবক্যাম বন্ধ হয়ে যায়। এবার এমন সকল সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ব্যবস্থা রাখছে নির্বাচন কমিশন।
সূত্রের খবর, বুথ দখল থেকে EVM-এর কোনও মেকানিকাল ফেলিওর, EVM-এ কারচুপির চেষ্টা, ছাপ্পা ভোট, পোলিং অফিসারদের উপর চাপ সৃষ্টি করা, ভোটারদের ভোটদানে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা বা যে কোনো ধরণের অশান্তির ঘটনা—সব ক্ষেত্রেই ফের নির্বাচন করার কথা জানিয়েছে কমিশন। না, শুধু নির্দেশ নয়, বরং সেই পরামর্শকে কড়াভাবে প্রয়োগ করতে চলেছে কমিশন। ইতিমধ্যেই কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, কোনও বুথে টানা আধঘণ্টা ওয়েবকাস্টিং বন্ধ থাকলেই সেই বুথে রিপোল করা হতে পারে। আর এই কারণেই দুই দফার নির্বাচনের মধ্যে বেশ কিছুদিনের গ্যাপ রাখা হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, স্ক্রুটিনির পর রিপোল ঘোষণা হয়। আর এর জন্য প্রয়োজন গোটা একটা দিন। ফলে সেই হিসেবে বাংলার দুই দফার নির্বাচনের পর অন্তত দু’বার করে রিপোল করাতে পারবে কমিশন।
গত বুধবার নির্বাচনের এ সকল বিষয় নিয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ, মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালা, ADG, কলকাতার পুলিশ কমিশনার, বিদ্যুৎ সচিব, পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা ও CESC–র কর্তাদের নিয়ে বৈঠক সেরেছেন। আর তারপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ভোটের আগে ও পরের দিন যাতে এলাকাগুলিতে লোডশেডিং না হয়, তা গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে। এমনকি, ঝড়-বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে বা কোথাও কোনও ফল্ট হলে তারও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কিছু এলাকার প্রতি বুথে একটি জেনারেটর রাখার কথাও বলা হয়েছে। এছাড়া, প্রতিটি সেক্টর অফিসে জেনারেটর রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে আপৎকালীন পরিস্থিতির মোকাবিলায় সেখান থেকে জেনারেটর নিয়ে যাওয়া যায়।
ইতিমধ্যেই ৬৪২টি এলাকাকে নেটওয়ার্ক পাওয়ার নিরিখে কমিশন প্রাথমিকভাবে রাজ্যের ‘শ্যাডো জ়োন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যার মধ্যে পাহাড়ি এলাকা দার্জিলিং, কালিম্পং অন্যতম। কারণ সেখানে ইন্টারনেট পরিষেবা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রতিটি টেলিকম সংস্থাকে ‘শ্যাডো জ়োনে’ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, ওয়েবকাস্টিং যেন কোনোভাবেই এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ না হয়। জানা গিয়েছে, বুথে ক্যামেরা বসানোর কাজ ভোটগ্রহণের সাত দিন আগে থেকে শুরু করে দিতে হবে এবং ভোটগ্রহণের দু’দিন আগে ওয়েবকাস্টিং চালু করে দিতে হবে। সেই সঙ্গে পুনর্নির্বাচন বিষয়টিকেও বেশ গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি এও জানানো হয়েছে, যে সকল বিধানসভা কেন্দ্রে একাধিক রিপোলের পরও নিরুপদ্রব ভোট করানো সম্ভব হবে না, সেই সব বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটের ফলাফল প্রকাশ স্থগিত রাখার কথা ঘোষণা করতে পারে কমিশন।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর ওয়েবকাস্টিং ব্যবস্থার পেছনে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করে কমিশন। আর এর উদ্দেশ্য একটাই—পেশিশক্তির ক্ষমতা প্রদর্শন বন্ধ করা এবং রিগিং রোখা। কিন্তু অনেকেই ভাবেন, ক্যামেরা নষ্ট করে দিয়ে বা রাউটার বন্ধ করে কারচুপি করা সম্ভব। কিন্তু কমিশন বলছে, প্রতিটি মেমোরি কার্ড এবং অফলাইন ব্যাকআপ প্রতিটি পদক্ষেপ রেকর্ড করছে। তবে, আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে শুধু ক্যামেরা থাকলেই হবে না, সেই ক্যামেরার লাইভ ফিড যারা মনিটর করছেন তাদের নিরপেক্ষতাও সমান জরুরি। তবে, প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, কারচুপির পথ ততটাই কঠিন হবে। তাই তো নির্বাচন কমিশনের কাছে ওয়েবক্যামেরা কেবল একটি যন্ত্র নয়, এটি স্বচ্ছতার মানদণ্ড। তাই আপনিও যদি বুথে দেখেন ক্যামেরা কাজ করছে না বা লেন্সটি কোনোভাবে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, তবে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনার কাজ প্রিসাইডিং অফিসারকে জানানো। নয়তো আপনিও হতে পারেন কারচুপির শিকার।