চোরবাগান ট্র্যাজেডিতে বাবা-মাকে হারিয়ে রাতারাতি অনাথ ২৫-এর যুবক !বরানগরে গিয়ে অভিভাবক হওয়ার প্রস্তাব শুভেন্দুর !

শারদোৎসবের আনন্দ নিমেষের মধ্যে রূপ নিয়েছিল বিভীষিকাময় এক ট্র্যাজেডিতে। উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে অকালে ঝরে গিয়েছে ১৯টি তাজা প্রাণ। বহু পরিবারের মাথার ছাদ এক লহমায় ধসে পড়েছে, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে স্বাভাবিক জীবন। সেই মর্মান্তিক বিপর্যয়েই বাবা ও মাকে একসঙ্গে হারিয়ে রাতারাতি সম্পূর্ণ একা ও অনাথ হয়ে পড়েছে বরানগরের ২৫ বছর বয়সী তরুণ পৃথ্বীশ ঘোষ। বাবা দিলীপ ঘোষ ও মা দিপালী ঘোষের নিথর দেহ ঘরে ফেরার পর থেকেই বুকভাঙা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে এলাকা। আর সেই চরম শোকের আবহে বিজয়া দশমীর দিনে নিহত দম্পতির বরানগরের বাড়িতে সশরীরে পৌঁছালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শোকার্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি এক নজিরবিহীন মানবিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অনাথ তরুণের সম্পূর্ণ অভিভাবকত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার প্রকাশ্য প্রস্তাব দিলেন তিনি!

দশমীর দুপুরে বরানগরের বাড়িতে গিয়ে নিহত দম্পতির আত্মীয়-স্বজন ও একমাত্র ছেলে পৃথ্বীশের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে সমস্ত রকম প্রশাসনিক ও আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি। এরপর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন— “এই ছেলেটির তো বাবা-মা দুজনেই চলে গেলেন। ও এখন সম্পূর্ণ একা। ও যদি চায়, তবে আমার কাছে থাকতে পারে। ওকে গাইড করা, ওর কাজকর্মের ব্যবস্থা করে দেওয়া— যাকে প্রকৃত অর্থে অভিভাবকত্ব বলে, একজন গার্ডিয়ানের মতো আমি ওর পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত। আমি ওর পরিবারের কাছে এই প্রস্তাব দিয়ে এসেছি। আমরাও অভিভাবক হতে পারি।” নিছক সরকারি নিয়মমাফিক ক্ষতিপূরণ দেওয়াই নয়, পিতা-মাতাহীন এক তরুণের ভবিষ্যৎ গড়ার এই মানবিক প্রস্তাব প্রত্যক্ষদর্শীদেরও আবেগাপ্লুত করে তোলে।

তবে মুখ্যমন্ত্রীর এই আন্তরিক প্রস্তাবের পর নিহত দম্পতির পরিবার এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। আবেগ ও বাস্তবতার দোলাচলে দাঁড়িয়ে নিহত দম্পতির নিকটাত্মীয় গোপালকুমার ঘোষ অত্যন্ত সংযত ভাষায় জানিয়েছেন— “সিদ্ধান্ত এত তাড়াতাড়ি তো নেওয়া যায় না। আমাদের পরিবারের অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে বসে আগে আলোচনা করতে হবে। মেজদা আছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলেই এ বিষয়ে পরবর্তী ভাবনাচিন্তা করা হবে।” ২৫ বছরের তরুণের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, সেই দোলাচল এখন গোটা পরিবারে।

এদিকে চোরবাগানের ভয়াল বিপর্যয়ে ১৯ জনের মৃত্যু এবং বহু মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় শুরু থেকেই কড়া ও সতর্ক প্রশাসনিক পদক্ষেপের পথে হেঁটেছে নবান্ন। ভবানী ভবনে কলকাতা পুলিশ কমিশনার সহ শীর্ষ আধিকারিকদের নিয়ে দফায় দফায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিহতদের পরিবার পিছু ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক প্যাকেজ হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন— ম্যাজিস্ট্রেট পদমর্যাদার আধিকারিকদের উপস্থিতিতেই দেহ হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সরকার প্রতিটি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বদ্ধপরিকর। পুজো দর্শনার্থীদের যাতায়াতে বিঘ্ন না ঘটিয়ে তিনি নিজে মৃতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বজনহারাদের সঙ্গে দেখা করছেন।

একই সাথে লালবাজার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম এবং কলকাতার স্পর্শকাতর পুজো মণ্ডপগুলিতে বিশেষ প্রশাসনিক দল পাঠিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী রাজনৈতিক দলগুলির উদ্দেশ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন— “এই বিপর্যয়ের সময়ে রাজনীতি থেকে দূরে থাকা উচিত। যে খামতি বা ত্রুটি হয়েছে, এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার ভবিষ্যতে সব রকম কঠোর পদক্ষেপ করবে।”

কাদের গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনায় এতগুলো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল, সেই প্রশ্নের উত্তর যখন আদালত ও বিশেষ তদন্ত দল খুঁজছে, তখন সব হারানোর ভিড়ে দাঁড়িয়ে বরানগরের অনাথ পৃথ্বীশের পাশে মুখ্যমন্ত্রীর অভিভাবক হওয়ার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে এক গভীর মানবিক বার্তার জন্ম দিল!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *