বিজেপি যে আদতে বসন্তের কোকিল এবং পরম স্বার্থপর, সুবিধাবাদী নেতাদের এক চরম অমানবিক আখড়া—তা আবারও হাতেনাতে প্রমাণিত হয়ে গেল। নির্বাচন মিটে যেতেই এবং ক্ষমতার চেয়ারে বসতেই কীভাবে তারা নিচু তলার কর্মী থেকে শুরু করে আমজনতাকে আর্বজনার মতো ছুড়ে ফেলে দেয়, তার এক কলঙ্কজনক অধ্যায় প্রকাশ্যে এসেছে। নিজের দলেরই একনিষ্ঠ কর্মী, যিনি গত ১০-১২ বছর ধরে দিনরাত এক করে বিজেপিকে জেতাতে রক্ত জল করেছেন, তাঁর ক্যানসার আক্রান্ত স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য দলের অন্তত দুই ডজন নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়ককে ফোন করলেও কেউ হাত বাড়িয়ে দেয়নি। অর্ণব লাহা নামের ওই সক্রিয় বিজেপি কর্মীর বুকফাটা আক্ষেপ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় করা একের পর এক বিষ্ফোরক পোস্ট এখন তোলপাড় ফেলে দিয়েছে গোটা রাজ্য রাজনীতিতে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দিয়ে ওই বিজেপি কর্মী লিখেছেন, তাঁর স্ত্রীর শরীরে মারণব্যাধি ক্যানসার ধরা পড়েছে। এই কঠিন বিপদের দিনে বিগত ১৫ দিন ধরে তিনি দলের বড় বড় নেতা, মন্ত্রী থেকে শুরু করে দুই ডজন জনপ্রতিনিধিকে বারবার ফোন করলেও কেউ তাঁর ফোন ধরার সৌজন্যটুকু দেখায়নি। বিন্দুমাত্র সাহায্য বা সহানুভূতি মেলেনি বিজেপির কোনো মহল থেকেই। হতাশ ও প্রতারিত অর্ণববাবু প্রশ্ন তুলেছেন, “এই জন্যই কি ১০-১২ বছর ধরে নিঃস্বার্থভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছিলাম?” যে দল নিজেদের একনিষ্ঠ কর্মীর চরম বিপদে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের অমানবিকতার মাত্রা কতটা নিচে নামতে পারে, তা ভেবে আকুল হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
শুধু দলের নেতাদের অমানবিকতাই নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের তথাকথিত ‘মডেল’ চিকিৎসা ব্যবস্থার আসল কঙ্কালসার চেহারাটাও তিনি টেনে বার করেছেন। কল্যাণী এইমস -এর মতো কেন্দ্রীয় হাসপাতালে চিকিৎসার নামে যে চরম উদাসীনতা ও অরাজকতা চলছে, তা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন ওই কর্মী। তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের এত বড় হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও কল্যাণী এইমসে রোগীদের গরু-ছাগলের মতো ফেলে রাখা হয়। আল্ট্রা হাই-রিস্ক রোগীদের প্রতি চিকিৎসকদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও গাফিলতি কল্পনার বাইরে। রাজ্য সরকারি হাসপাতাল এসএসকেএম কিংবা এনআরএস এর চেয়ে হাজার গুণ ভালো পরিষেবা দেয় বলে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে স্বীকার করে নিয়েছেন।
বিজেপির এই সাড়ে তিন মাসের রাজত্বে সাধারণ মানুষের ওপর তো অত্যাচার ও লুটপাট চলছিলই, এবার তাদের নিজেদের কর্মী-সমর্থকদেরও যে একই দুর্দশার শিকার হতে হচ্ছে, তা স্পষ্ট। একের পর এক কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়ে গিয়েছে—ভোটে জেতার আগে মিষ্টি কথা আর ভোটের পরে সাধারণ মানুষকে শোষণ করা এবং নেতাদের ফোন বন্ধ করে পালিয়ে যাওয়াই বিজেপির আসল চরিত্র। রাজনৈতিক মহলের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সক্রিয় কর্মীর প্রতিবাদ কেবল একটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ বিজেপি সরকারের সুবিধাবাদী রাজনীতির আসল মুখোশটা আজ সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তাঁদের নিজেদের কর্মীদের কাছেও চিরতরে খুলে গিয়েছে।
