শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই এবার রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনিক স্তরে থাকা লক্ষ লক্ষ চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ওপর ঝুলতে শুরু করল চরম অনিশ্চয়তার খাঁড়া! পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে গত ১৫ বছর ধরে নিয়োগ হওয়া সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ সহ সমস্ত ধরনের চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা আইনি ও স্বচ্ছ ছিল— এবার তা সরাসরি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার। নবান্ন সূত্রে খবর, মুখ্যসচিবের তরফে ইতিমধ্যেই প্রতিটি জেলায় নির্দেশ পাঠানো হয়েছে, যার আওতায় বিগত জমানায় নিযুক্ত চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, শারীরিক সক্ষমতার মাপকাঠি এবং নিয়োগের সমস্ত নথিপত্র কঠোরভাবে স্ক্রুটিনি করা হবে। আর এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে থাকা প্রায় লক্ষাধিক সিভিক ভলান্টিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয়েছে চরম চাঞ্চল্য ও উৎকণ্ঠা।
নবান্নের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের পেছনে শাসকদলের রাজনৈতিক দর্শন ও স্বচ্ছতার অঙ্গীকারকে তুলে ধরছে বর্তমান প্রশাসন। বিজেপি নেতৃত্ব শুরু থেকেই অভিযোগ করে এসেছে— বিগত জমানায় রাজ্য সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক পদের নামে দলীয় কর্মী ও ঘনিষ্ঠদের দেদার নিয়োগ করা হয়েছিল। যোগ্য ও সাধারণ বেকার যুবক-যুবতীদের বঞ্চিত করে কেবলমাত্র দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতেই বিলি করা হয়েছিল এই সমস্ত অস্থায়ী কাজ। বিরোধীদের এই দাবির সপক্ষে অতীতে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর একটি প্রকাশ্য মন্তব্যকেও টেনে এনেছে গেরুয়া শিবির; যেখানে তিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন— যাঁরা দলের হয়ে দেওয়াল লিখেছেন, মিছিলে হেঁটেছেন এবং ভোট চেয়েছেন, চাকরি তাঁদেরকেই অগ্রাধিকার দিয়ে দেওয়া হবে। এই ধরনের অনিয়মের ফলেই পূর্বে স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিযুক্ত প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীকে আদালতের রায়ে চাকরি হারাতে হয়েছিল, যার মধ্যে ১ হাজার ৮১৪ জনকে সরাসরি ‘অযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি রুখতেই এবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের গভীর ক্ষততে হাত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নবান্ন।
বিশেষ করে নিশানার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সিভিক ভলান্টিয়ার ও ভিলেজ পুলিশের বাহিনী। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সালে তৎকালীন মন্ত্রিসভা এক ধাক্কায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগের ছাড়পত্র দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই বাহিনীর ভূমিকা, দায়িত্বের সীমারেখা এবং প্রশাসনিক আচরণ নিয়ে জল গড়িয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট থেকে দেশের শীর্ষ আদালত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল— আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা এই বাহিনীকে কার্যত দলীয় ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করা হতো এবং স্থানীয় স্তরে বিরোধী স্বর দমন ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেই তাদের অপব্যবহার চলত। এমনকি থানার নিয়মিত পুলিশ অফিসারদের চেয়েও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো।
এই প্রেক্ষিতে বিজেপি পরিষদীয় দলের এক বিধায়ক স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেছেন— “যোগ্যতা ছাড়া কেবলমাত্র দলীয় নেতাদের তোষণ করে, বাজার করে দেওয়ার বিনিময়ে বা নিলামের মতো টাকা দিয়ে এই চাকরি বিক্রি হয়েছে কিনা, তা রাজ্যের মানুষের জানা প্রয়োজন। সরকারি কোষাগারের টাকায় কোনো অযোগ্য বা বেআইনিভাবে নিযুক্ত ব্যক্তি কাজ চালিয়ে যেতে পারেন না।”
যদিও এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা স্ক্রুটিনির পর অযোগ্যদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে নবান্নের এই কড়া নির্দেশ ঘিরে যে পুলিশ মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তা পরিষ্কার।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও স্বচ্ছতা ফেরানোর সরকারি উদ্যোগ বনাম দীর্ঘ বছর ধরে কর্মরত লক্ষাধিক যুবকের রুটিরুজির অনিশ্চয়তা— সিভিক ভলান্টিয়ারদের নথি যাচাইয়ের এই নির্দেশিকা বদলের বাংলার রাজনীতি ও প্রশাসনে যে এক নতুন তোলপাড় সৃষ্টি করতে চলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!