একদিনের রাজনৈতিক সভার মাসুল ১১ হাজার কোটি টাকা!দিল্লির রামলীলা ময়দানে ইন্ডিয়া জোটের সভা ঘিরে ব্যবসায়ীদের তীব্র ক্ষোভ !

রাজনীতির ক্ষমতা প্রদর্শনের আস্ফালনে বলি হতে হলো দেশের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্রের সাধারণ ব্যবসায়ীদের! দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে আয়োজিত বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের মেগা রাজনৈতিক সমাবেশ ঘিরে এবার চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষে ফেটে পড়ল রাজধানী দিল্লির বণিক মহল। আলোর উৎসব দীপাবলির ঠিক মুখে, যখন বছরের সবচেয়ে জমজমাট কেনাবেচার মরশুম চলে— ঠিক তখনই রবিবার একদিনের রাজনৈতিক কর্মসূচির জেরে কার্যত অচল হয়ে পড়ল মধ্য ও পুরনো দিল্লির প্রধান প্রধান বাজারগুলি। আর তার ফলেই দিল্লির অর্থনীতিতে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় নেমে এসেছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার অভূতপূর্ব আর্থিক ধাক্কা! বিরোধী জোটের এই কর্মসূচির বিরুদ্ধে এবার সরাসরি সোচ্চার হয়ে ক্ষতির পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ান তুলে ধরেছে দিল্লির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংগঠন ‘চেম্বার অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ বা সিটিআই।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য— আলোর উৎসব দীপাবলি ও ধনতেরাসের প্রাক্কালে দিল্লির পাইকারি ও খুচরো বাজারগুলিতে দেশজুড়ে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। ঠিক এই চরম ব্যস্ত সময়েই ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে মেগা জনসভার ডাক দেয় রাহুল গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়দের ইন্ডিয়া জোট। জনসভার সম্ভাব্য প্রভাব ও যানজটের আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে আগেই বিরোধী নেতাদের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছিল বণিক সংগঠন সিটিআই। স্বয়ং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সহ একাধিক শীর্ষ বিরোধী নেতাকে চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করা হয়েছিল— উৎসবের মরশুমে ব্যবসায়ীদের রুটিরুজির কথা ভেবে এই রাজনৈতিক সভাটি যেন দীপাবলির পর আয়োজন করা হয়। কিন্তু সেই মানবিক ও বাণিজ্যিক অনুরোধে কর্ণপাত না করেই জেদ বজায় রেখে রবিবারে সভার আয়োজন করা হয় বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সিটিআই।

কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এই একদিনের রাজনৈতিক জমায়েতে?

সিটিআই যে হিসাব সামনে এনেছে, তা চোখ কপালে তোলার মতো! রামলীলা ময়দানকে কেন্দ্র করে ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা দিল্লির একাধিক ঐতিহ্যবাহী ও প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক এলাকা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কাশ্মীরী গেট, চাঁদনি চক, সদর বাজার, করোল বাগ, খারি বাওলি, নয়া বাজার, দরিয়াগঞ্জ, পাহাড়গঞ্জ থেকে শুরু করে অভিজাত কনৌট প্লেস এবং গফ্ফর মার্কেট— সর্বত্রই স্তব্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক কাজকর্ম। সিটিআই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই অঞ্চলে থাকা প্রায় ৩ লক্ষ দোকানের মধ্যে প্রায় আড়াই লক্ষ দোকানই সভার দিন বন্ধ রাখতে বাধ্য হন ব্যবসায়ীরা। যার ফলে পাইকারি ও খুচরো বেচাকেনায় প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা!

শুধু দোকানের বেচাকেনাই নয়, রামলীলা ময়দান থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পুলিশের কড়া ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও রাস্তা বন্ধের কারণে পণ্যবাহী ট্রাক ও লজিস্টিক পরিষেবায় ধাক্কা লেগেছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার। এর পাশাপাশি জরুরি হাসপাতাল পরিষেবা, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটন ক্ষেত্রে ক্ষতি হয়েছে আরও ৫০০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকায়!

ব্যবসায়ী মহলের একটাই ক্ষুব্ধ প্রশ্ন— রাজনৈতিক দলগুলির নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের খেলায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের যে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হলো, তার দায়ভার এখন কে নেবে?

যদিও নির্লজ্জের মতো এই বিপুল আর্থিক ক্ষতির দায় সরাসরি মোদি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের কোর্টেই ঠেলে দিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর পালটা দাবি— ইন্ডিয়া জোটের এই মহাসমাবেশে সাধারণ মানুষের বাঁধভাঙা ভিড় আটকাতে কেন্দ্রের বিজেপি প্রশাসনই নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জোর করে ব্যবসায়ীদের দোকান বন্ধ করতে বাধ্য করেছে এবং রাস্তাঘাট আটকে কৃত্রিম অচলাবস্থা তৈরি করেছে।

একদিকে ব্যবসায়ীদের কান্না আর ১১ হাজার কোটির বিপুল লোকসানের হিসাব, অন্যদিকে কেন্দ্র-বিরোধীর তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর— রামলীলা ময়দানের এই রাজনৈতিক সংঘাত দিল্লির গলি থেকে রাজপথের অর্থনৈতিক সমীকরণকে চরম উত্তপ্ত করে তুলল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *