সামনেই হাইভোল্টেজ উপনির্বাচন। আর সেই নির্বাচনের মহারণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনের শুভলগ্নেই নন্দীগ্রামের পুণ্যভূমিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারের দামামা বাজিয়ে দিলেন বিজেপি প্রার্থী হাসিরানী রথ। গত মঙ্গলবার খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে পাশে নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর, বৃহস্পতিবার নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়ায় দলীয় বিধায়ক কার্যালয়ে এক মেগা সাংগঠনিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। তবে প্রচারের প্রথম দিনেই ছেলে হারানোর দগদগে ক্ষত আর অতীতে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের করা বিতর্কিত মন্তব্য টেনে এনে রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটালেন নিহত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথের মা!
রেয়াপাড়ার বিধায়ক কার্যালয়ে তমলুক সাংগঠনিক জেলার সভাপতি মলয় সিংহ, কাঁথির সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী, দলীয় মণ্ডল সভাপতি এবং ১৭টি গ্রাম পঞ্চায়েতের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নিয়ে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন হাসিরানী দেবী। দলীয় কর্মীদের সামনে দাঁড়িয়ে গভীর আবেগ চেপে রেখে তিনি বলেন— “এত মানুষের ভিড় আর সংগঠনের এই উদ্দীপনার মাঝেও আমার ভেতরে একটা বিশাল শূন্যতা হাহাকার করছে। আপনারা যারা সংগঠন করেন, তারা সবাই আমার ছেলে চন্দ্রনাথকে নিজের ভাইয়ের মতো চিনতেন। কিন্তু ছেলের সেই আত্মবলিদানের শোককে শক্তিতে পরিণত করেই আজ আমাকে মানুষের অধিকারের জন্য এই লড়াই লড়তে হচ্ছে।”
এরপরই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক অতীত সভাকে কাঠগড়ায় তুলে চরম রাজনৈতিক চাঞ্চল্য তৈরি করেন হাসিরানী রথ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন— নির্বাচনের ঠিক কিছু দিন আগেই এক প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, শুভেন্দুবাবুর রথকে নাকি উল্টো করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে! হাসিরানী দেবীর বিস্ফোরক অভিযোগ— “আমরা তখন সরল বিশ্বাসে ভেবেছিলাম হয়তো রাজনৈতিক বিজয় রথের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তখন থেকেই কি তবে আমার ছেলে চন্দ্রনাথ রথকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো গোপন ছক চলছিল? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুরের ময়দানে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজয় কোনোদিনই মেনে নিতে পারেননি, আর সেই আক্রোশ থেকেই হয়তো এমন জঘন্য ঘটনা ঘটানো হয়েছে।” তবে অভিভাবক শুভেন্দু অধিকারী পাশে থাকায় এবং সিবিআই তদন্ত চলায় ছেলের হত্যার সুবিচার যে মিলবেই, সেই অটুট আস্থার কথাও জানান তিনি।
নন্দীগ্রামবাসীর উদ্দেশে আবেগঘন বার্তা দিয়ে হাসিরানী দেবী সাফ জানিয়ে দেন— নন্দীগ্রাম শুভেন্দুবাবুর কোনো ছেড়ে যাওয়া আসন নয়; তিনি এই মাটির সন্তান এবং সর্বদাই মানুষের পাশে আছেন ও থাকবেন। মুখ্যমন্ত্রীর সেই মূল স্লোগান— ‘সকলের জন্য ছাদ এবং সকলের জন্য ভাত’— এই অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে নন্দীগ্রামের সেবা করে যাবেন।
একই সুর শোনা গিয়েছে কাঁথির বিজেপি সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারীর গলাতেও। বিরোধীদের কড়া আক্রমণ শানিয়ে তিনি বলেন— দল ও প্রতীক হারিয়ে তৃণমূল এখন শুধু নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য লড়াই করছে, আর ভারতীয় জনতা পার্টি নন্দীগ্রামের মাটিতে ১ লক্ষ ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে ঐতিহাসিক বিজয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। শুধু তাই নয়, এলাকার সংখ্যালঘু ভাই-বোনদের কাছেও সরাসরি উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দিয়ে সৌমেন্দু অধিকারী আহ্বান জানান— বিজেপি কোনো ভেদাভেদ করে না, উন্নয়ন সবার ঘরে পৌঁছায়; তাই অতীতের মিথ্যা প্রচার ভুলে এই উপনির্বাচনে সংখ্যালঘু সমাজকেও বিজেপির পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। সব মিলিয়ে, আবেগ আর তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে নন্দীগ্রামের জমি পুনরুদ্ধারের এই লড়াই যে নতুন মোড় নিল, তা বলাই বাহুল্য!
