মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং রক্তক্ষয়ী সৌদি-ইয়েমেন যুদ্ধের পটভূমিতে আচমকাই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল এক চরম চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল খবর! দাবি করা হচ্ছে— দুই দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে মোতায়েন থাকা পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর নারী সদস্যদের মধ্যে অন্তত ১২৫ জন নাকি গর্ভবতী হয়ে পড়েছেন এবং এই পরিস্থিতির কারণে তাঁদের তড়িঘড়ি স্বদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ইউনিফর্ম পরা নারী সেনাদের ছবি ও বিভিন্ন ধরণের চাঞ্চল্যকর তথ্য সহ এই খবরটি দাবানলের মতো ভাইরাল হতে শুরু করেছে। কিন্তু এই সংবেদনশীল সামরিক সংবাদের পেছনে আসল সত্যতা কতটা, নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা AI-কে হাতিয়ার করে ফের এক আন্তর্জাতিক প্রোপাগান্ডার জাল বোনা হলো— তা নিয়েই এখন আন্তর্জাতিক মহলে উঠছে বিরাট প্রশ্ন।
ভাইরাল হওয়া ওই পোস্টগুলিতে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে দাবি করা হচ্ছে যে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অংশ হিসেবে পাকিস্তান নাকি সম্প্রতি পাঁচ হাজারেরও বেশি নারী সেনাসদস্যকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সহায়ক দায়িত্বে পাঠিয়েছিল। সেই প্রেক্ষিতেই সেখানে এই ব্যাপক গর্ভধারণের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি ওঠে। এমনকি কিছু কিছু অতি-উত্তেজক পোস্টে যৌন হেনস্থা বা নিপীড়নের মতো চরম অভিযোগও জুড়ে দেওয়া হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন— এই নারী জওয়ানরা কি তাঁদের স্বামীদের সাথে সেখানে গিয়েছিলেন, নাকি এই নারকীয় পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে অন্য কোনো অন্ধকার অধ্যায়?
কিন্তু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা এবং সামরিক বিশ্লেষকদের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানে সম্পূর্ণ বিপরীত এক সত্য উঠে আসছে। প্রথমত, পাকিস্তান সেনাবাহিনী কিংবা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তরফ থেকে এই ধরনের কোনো ঘটনার বিন্দুমাত্র আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক সত্যতা মেলেনি। কোনো শীর্ষ আন্তর্জাতিক মূলধারার সংবাদমাধ্যমও এমন তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং আধুনিক ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে— খবরের সাথে জুড়ে দেওয়া অধিকাংশ ছবিই অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-জেনারেটেড প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।
সামরিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই দাবির ফাঁকফোকর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গোটা পাকিস্তান সেনাবাহিনীতেই মোট নারী সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজারের কাছাকাছি। আর এই নারী সদস্যদের সিংহভাগই কাজ করেন মেডিকেল কোর, প্রশাসনিক বিভাগ, সিগন্যালস কিংবা শিক্ষামূলক শাখায়। কোনো ফ্রন্টলাইন বা সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে এত বিশাল সংখ্যক নারী সেনাকে বিদেশে মোতায়েন করার কোনো ঐতিহাসিক নজির বা সরকারি নথি পাকিস্তান ফৌজের ইতিহাসে নেই। অতীতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা বা বায়ুসেনার দল পাঠানো হলেও, তা মূলত ছিল প্রশিক্ষক ও পুরুষ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত।
সামরিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে— ইয়েমেন সংঘাতের আবহে সৌদি-পাকিস্তান সামরিক ঘনিষ্ঠতা যখন বাড়ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে দুই দেশের যৌথ বাহিনীর মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই ধরনের বিকৃত ও বানোয়াট কনটেন্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে। কোনো যাচাইকৃত তথ্য বা সরকারি বিবৃতি ছাড়া এমন ভুয়ো খবর ছড়িয়ে পড়া যেমন অত্যন্ত উদ্বেগের, তেমনই তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোড়ন ফেলে দেওয়া এই খবরটির বাস্তব কোনো অস্তিত্ব এখনও মেলেনি। আধুনিক ডিজিটাল যুদ্ধের যুগে যেকোনো চাঞ্চল্যকর পোস্ট বা ছবি দেখেই বিভ্রান্ত না হয়ে, নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রের ওপর ভরসা রাখাই যে প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব— এই ভাইরাল ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ!
