দীপাবলিতে আলোর মাঝেই আঁধার নেমে এল হাজার পরিবারে !২০১৬ প্যানেল বাতিলের পর পুনঃ পরীক্ষায় ফেল করে চিরতরে চাকরি হারালেন ১ হাজার শিক্ষাকর্মী!

আলোর উৎসব দীপাবলির আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে রূপ নিল এক চরম অন্ধকারে! দীর্ঘ ১১ বছর ধরে বিদ্যালয়ে সততার সাথে দায়িত্ব পালনের পর আচমকাই চিরতরে চাকরি খোয়ালেন ২০১৬ সালের প্যানেলভুক্ত প্রায় এক হাজার তথাকথিত ‘যোগ্য’ শিক্ষাকর্মী। শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি ২০১৬ সালের বিতর্কিত এসএসসি গ্রুপ-সি এবং গ্রুপ-ডি প্যানেল আদালতের নির্দেশে বাতিল হয়ে যাওয়ার পর যে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি কর্মীকে কাজ হারাতে হয়েছিল, তাঁদের পুনর্বহালের জন্য আয়োজিত পুনর্প পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়ে এবার চূড়ান্তভাবে বেকার হয়ে পড়লেন তাঁরা। উৎসবের আবহে প্রকাশিত এই পরীক্ষার ফলাফল যেন তাঁদের পরিবারে এনে দিল চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়।

নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে আদালতের নির্দেশে ২০১৬ সালের গোটা প্যানেলটি বাতিল হওয়ার পর চাকরি হারিয়েছিলেন প্রায় ৩,৩০০ জন শিক্ষাকর্মী। এরপর আদালতের পর্যবেক্ষণে গত মার্চ মাসে নতুন করে লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। যেখানে পুরনো চাকরিহারাদের পাশাপাশি নতুন চাকরিপ্রার্থী মিলিয়ে মোট প্রায় ২ লক্ষ পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সেই লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হতেই দেখা যায় এক নির্মম চিত্র। নতুন প্রজন্মের পরীক্ষার্থীদের সাথে মেধার তীব্র প্রতিযোগিতায় কাট-অফ নম্বরের ধারেকাছে পৌঁছাতে পারেননি পুরনো চাকরিহারাদের একটি বড় অংশ। যার ফলে প্রায় ১ হাজার জন কর্মরত ব্যক্তি এই পুনর্প পরীক্ষায় ফেল করেছেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, সরকারি চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ায় এই চাকরিহারাদের পক্ষে ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় বসা সম্ভব নয়। ফলে চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে নতুন করে বিকল্প পেশা বেছে নেওয়া ছাড়া তাঁদের সামনে আর কোনো পথ খোলা রইল না।

ফলাফল প্রকাশের পরই রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতা দেবজিৎ সরকার শাসকদলকে সরাসরি কাঠগড়ায় তুলে বলেন— “আজকের এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী তৃণমূলের দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা। দলীয় নেতারা যে অসাধু উপায়ে চাকরি বিক্রি করেছিল, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে সাধারণ ও প্রকৃত যোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের। যাঁরা সৎভাবে চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁরাও এই নোংরা ব্যবস্থার বলি হলেন।”

একই সুরে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ। তৃণমূলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে তিনি বলেন— “এটা ওদের পনেরো বছরের সীমাহীন পাপের ফল। চিটিংবাজি করে যাঁরা কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি বানিয়েছিল, তাদের দায় এখন সাধারণ মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। আমাদের আশঙ্কা ছিল যে আইনের জটিলতায় হয়তো হাজার-বারোশো যোগ্য কর্মীকে কাজ হারাতে হতে পারে, আজ সেটাই নির্মমভাবে সত্যি হলো। কোনো অপরাধ না করেও শুধু তৃণমূলের দুর্নীতির শিকার হয়ে আজ এই পরিবারগুলিকে পথে বসতে হচ্ছে।”

অন্যদিকে এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ অত্যন্ত সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন— “বিষয়টি সম্পূর্ণ আইন ও আদালতের বিচারাধীন। সংশ্লিষ্ট আইনি বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি দেখছেন। যদি সত্যিই কেউ যোগ্য হয়েও বঞ্চিত হন, তবে তিনি নিশ্চয়ই আইনি পথেই ন্যায়বিচার পাওয়ার আবেদন করতে পারেন। তবে পুরো বিষয়টি যেহেতু পরীক্ষা ও আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হচ্ছে, তাই যাঁরা আইনি দিকটি দেখছেন তাঁরাই এর সদুত্তর দিতে পারবেন।”

একদিকে আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণ আর দুর্নীতির কালিমা মোছার পরীক্ষা, অন্যদিকে বহু বছর চাকরি করার পর মাঝবয়সে এসে কর্মহীন হয়ে পড়ার আর্তনাদ— দীপাবলির মুখে হাজার পরিবারে নেমে আসা এই আঁধার রাজ্যের নিয়োগ দুর্নীতির ক্ষতকে ফের একবার চরম নিষ্ঠুরতার সাথে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিল!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *