বাংলায় ভোট! আর এই কারণেই রাজনৈতিক দলগুলি বর্তমানে তাদের ইশতেহার প্রকাশ ও ভোট প্রচারে ব্যস্ত। তাই দিন কয়েক আগে রাজ্যে এসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। না, তিনি শুধু রাজ্যে আসেনি, বরং বলা ভালো যে তিনি রাজ্য-রাজনীতিতে আগুন ছড়িয়ে দিতে এসেছেন। কারণ বঙ্গে পা রেখেই একাধিক জনসভা থেকে তৃণমূলকে চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণ করে চলেছেন তিনি। সম্প্রতি মালদাতে অনুষ্ঠিত এক জনসভা থেকেও সেই একই রূপ ধরা পড়লো শাহের। যেখানে তার মুখে উঠে এল রাম মন্দির, বাবরি মসজিদ, অনুপ্রবেশ, শরণার্থী-সহ আরও নানা প্রসঙ্গ। না, এই তালিকা থেকে বাদ পড়েনি তৃণমূলের দুর্নীতির কথা। সেই সঙ্গে আত্মবিশ্বাসের সাথে তাকে বলতে শোনা যায়, ২৬-এর নির্বাচনে বাংলার মসনদে গেরুয়া ঝড়ের আধিপত্য বিস্তার হবে। আর তারা ক্ষমতায় এলে কী কী হতে চলেছে তাও আবারও এদিন মনে করিয়ে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিন নিজের বক্তৃতার শুরুতেই সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে শাহ বলেন, বিজেপি যদি বাংলায় ক্ষমতায় আসে, তবে রাম মন্দিরের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং তুষ্টিকরণের রাজনীতি বন্ধ হবে। এরপরই বাবরি মসজিদের নাম উল্লেখ করে তিনি বিরোধীদের একহাত নেন। তার কথায়, রাহুল গান্ধী বলতেন, ‘মন্দির ওখানেই বানাবো। কিন্তু কবে বানাবেন সেই তারিখ বলবো না।’ এদিকে মোদীজি তারিখও বলেছেন আর মন্দির তৈরি করে প্রাণপ্রতিষ্ঠাও করেছেন। অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরি হয়েছে, সেখানে রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছে। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, বিজেপি যদি বাংলায় ক্ষমতায় আসে, তবে এখানে আর কোনোদিন বাবরি মসজিদ তৈরির কথা কেউ ভাবতেও পারবে না।” মনে করিয়ে দিই, বাংলায় বাবরি মসজিদ হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীর। এর জন্য তিনি নানা প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছেন বলেও সে সময় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছিলেন। তবে, বাংলায় পদ্ম ফুটলে সেই ইচ্ছা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন চিহ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এরপরই অনুপ্রবেশ ও শরণার্থী প্রসঙ্গে মুখ খুলতে শোনা যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। তার কথায়, “মমতা দিদি অনুপ্রবেশকারীদের জন্য রেড কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছেন, কারণ তারা ওনার ভোটব্যাঙ্ক। কিন্তু আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, বাংলায় বিজেপি সরকার গড়লে একজনও অনুপ্রবেশকারী সীমান্ত পার করে এপারে আসতে পারবে না। CAA মানে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাথর দিয়ে খোদাই করা সত্য বলে মনে হবে। যা কোনোভাবেই আটকানো যাবে না।” তিনি এও জানান যে, এই আইনের মাধ্যমেই হিন্দু শরণার্থীরা স-সম্মানে ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। এর পাশাপাশি তৃণমূল সরকার যে বাংলাকে দুর্নীতি আর তোষণের আখড়া বানিয়ে ফেলেছে, তাও এদিন তিনি সকলের সামনে তুলে ধরেন। শাহ বলেন, বাংলায় সাধারণ মানুষের টাকা চুরি করে নিজেদের পকেট ভরছে রাজ্য সরকার। তাই বাংলার সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হলে এই তুষ্টিকরণের রাজনীতি উপড়ে ফেলতে হবে। মোদীজির নেতৃত্বে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন শুধু বিজেপি পূরণ করতে পারে বলেও এদিন দাবি করেন তিনি।
যদিও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি বাংলায় তাদের তুরুপের তাস হিসেবে ‘রাম মন্দির’ এবং ‘তুষ্টিকরণের রাজনীতি’র অবসানকেই বেছে নিতে চাইছে। পাশাপাশি অযোধ্যার রাম মন্দিরের নির্মাণকে সাফল্যের খতিয়ান হিসেবে তুলে ধরে এবং বাবরি মসজিদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মূলত বাংলার হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে সংহত করার একটি কৌশলী বার্তাও দিয়েছেন। তবে বাংলার রাজনৈতিক আবহাওয়ায় এই মেরুকরণের ভাষা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন রয়েছে। কারণ একদিকে যেমন বিজেপি অনুপ্রবেশ রোধ এবং শরণার্থী ইস্যুকে হাতিয়ার করে এগোচ্ছে, তেমন অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস বারবারই একে ‘বিভেদকামী রাজনীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির কার্ড খেলছে। ফলে সাধারণ মানুষ উন্নয়নের নিরিখে ভোট দেবেন, নাকি এই ধর্মীয় ও আবেগপ্রবণ ইস্যুগুলোই ব্যালট বাক্সে নির্ধারক ভূমিকা নেবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে, বাংলার রাজনীতির ভবিষ্যৎ যে এখন এই দুই বিপরীতমুখী আদর্শের লড়াইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা বেশ বোঝাই যাচ্ছে।