নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ নিয়ে মতুয়া সমাজের বহুদিনের উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা আর বিভ্রান্তির মেঘ এবার পুরোপুরি কেটে যাওয়ার পথে! বনগাঁর পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে মতুয়া সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের লড়াইকে পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়ে এক ঐতিহাসিক প্রশাসনিক সুবিধার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার স্পষ্ট ভাষায় তিনি আশ্বাস দিয়ে জানালেন— সিএএ নিয়ে সাধারণ মানুষকে আর কোনো সরকারি জটিলতা বা প্রশাসনিক হেনস্থার মুখে পড়তে হবে না; এবার থেকে আবেদনকারীদের সরাসরি স্ব স্ব জেলার জেলাশাসক বা ডিএম অফিস থেকেই নাগরিকত্ব শংসাপত্র দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে! একই সঙ্গে মতুয়া সমাজের একজন মানুষও যাতে ভারতের স্থায়ী নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, পুজো মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই পবিত্র অঙ্গীকারও করে এলেন মুখ্যমন্ত্রী।
মঙ্গলবার উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ উত্তরের বিধায়ক তথা রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনীয়ার উদ্যোগে আয়োজিত গান্ধিপল্লি বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাবের দুর্গাপুজোর উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি পরিষ্কার জানান— সিএএ প্রক্রিয়ায় আর কোনো আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা রাখা হবে না। যাঁরা ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করবেন, তাঁদের শংসাপত্র যাচাই ও হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় জেলাশাসকের দফতর সরাসরি মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। স্থানীয় মতুয়া ভক্তদের বিপুল সমাগমের সামনে বুক বাজিয়ে শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন— “আমি কথা দিয়ে গেলাম, মতুয়াদের কাউকে বাদ দেওয়া হবে না। সবাইকে সম্মান ও মর্যাদার সাথে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।”
দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী বনগাঁ মহকুমায় সিএএ কার্যকর হওয়া এবং স্থায়ী শংসাপত্র পাওয়াকে ঘিরে যে রাজনৈতিক অপপ্রচার চালাচ্ছিল বিরোধীরা, মুখ্যমন্ত্রীর এই প্রশাসনিক নিশ্চয়তা সেই সমস্ত জল্পনার কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিল। মতুয়া মহলে এই ঘোষণার পর স্বভাবতই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের আবহ তৈরি হয়েছে।
তবে শুধু নাগরিকত্বের আশ্বাসই নয়, সীমান্তবর্তী বনগাঁর ভৌগোলিক স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে জাতীয় নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশের প্রশ্নেও এদিন একচুল আপস না করার চরম বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি চাঁচাছোলা ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন— “বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে কোনো জিহাদিকে বাংলায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। রাজ্যে কোনো ধরনের ‘লাভ জিহাদ’ বরদাস্ত করা হবে না।” তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে সীমান্ত দিয়ে ওপার বাংলা থেকে এসে কেউ এ দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে পুলিশ ও প্রশাসনকে কঠোরতম পদক্ষেপ নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধীদের তীব্র ভাষায় কটাক্ষ করে এলাকাবাসীকে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন— “আরশোলা ও ছারপোকারা চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আপনারা এদের প্ররোচনা থেকে সতর্ক থাকবেন।” পাশাপাশি যারা নানা ছুতায় ‘আজাদি কাশ্মীর’ স্লোগান তুলে বিশৃঙ্খলা পাকানোর চেষ্টা করে, সেই সমস্ত ‘দিমাগি নকশাল’দের বিরুদ্ধেও সমাজকে সতর্ক থাকার কড়া বার্তা দেন তিনি।
গান্ধিপল্লির পর হাবরার বিধায়ক দেবদাস মণ্ডলের উদ্যোগে আয়োজিত ঐক্য সম্মেলনের দুর্গাপুজোর উদ্বোধনেও অংশ নেন মুখ্যমন্ত্রী। সব মিলিয়ে, পুজোর উৎসবের আবহে মতুয়া সমাজের হাতে ডিএম অফিস থেকে সিএএ শংসাপত্র পৌঁছে দেওয়ার এই প্রতিশ্রুতি এবং কড়া সীমান্তনীতি— উত্তর ২৪ পরগনার রাজনীতিতে যে এক বিরাট নির্ণায়ক মোড় এনে দিল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই!
