বাংলায় ভোট মানেই কি ভয়? ভোট মানেই কি পাড়ায় পাড়ায় বাইকের কানফাটানো আওয়াজ আর হেলমেট পরা কিছু যুবকের দাপাদাপি? অনেক হয়েছে! দশকের পর দশক ধরে বাংলার সাধারণ মানুষ যে ‘বাইক বাহিনী’র আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকত, এবার তাদের ডানা ছাঁটতে বড় পদক্ষেপ নিল ভারতের নির্বাচন কমিশন। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ নতুন নিয়ম জারি করেছে কমিশন। আর এই খবরেই এখন কাঁপুনি ধরেছে সেইসব নেতাদের, যারা বাইক বাহিনীর ওপর ভরসা করে বৈতরণী পার হতে চেয়েছিলেন।
কী এই নতুন নিয়ম?
নিয়মটা খুব স্পষ্ট। ভোটের আগে এবং ভোটের দিন বাইকের যথেচ্ছ ব্যবহার আর চলবে না। কমিশন জানিয়েছে, ভোটের দিন তো বটেই, এমনকি ভোটের প্রচার পর্বেও নির্দিষ্ট নিয়মের বাইরে বাইক চালানো বা বাইক মিছিল করা যাবে না। বিশেষ করে ভোটগ্রহণের ৭২ ঘণ্টা আগে থেকেই এলাকার বাইক চলাচলের ওপর কঠোর নজরদারি চালাবে কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। নির্দেশিকায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরের দিন সকাল ৬টা পর্যন্ত বাইক নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এই সময়ের মধ্যে কোনও ব্যক্তি যদি অকারণে বাইক নিয়ে রাস্তায় বের হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে, জরুরি প্রয়োজনে বাইক ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন— হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হলে বা সন্তানের স্কুল সংক্রান্ত কোনও জরুরি কাজে বাইক নিয়ে বের হওয়া যাবে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও প্রমাণসাপেক্ষ কারণ দেখাতে হবে। এছাড়া, প্রয়োজন ছাড়া বাইকের পিছনের আসনে কাউকে বসানো যাবে না।
কেন এই সিদ্ধান্ত?
কারণ বিজেপি বারবার দাবি তুলেছিল যে, বাংলায় অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট করতে গেলে এই ‘বাইক সংস্কৃতি’ বন্ধ করতে হবে। শাসকদলের আশ্রিত কিছু দুষ্কৃতী যেভাবে ভোটারদের ভয় দেখাতে বাইক নিয়ে মহড়া দেয়, তা বন্ধ হওয়া গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন কমিশন এবার সেই দাবিতেই সিলমোহর দিল। আচ্ছা ভাবুন তো, এই বাইক রুখলে কার সমস্যা হওয়ার কথা? একজন সাধারণ শান্তিপ্রিয় ভোটারের? নিশ্চয়ই নয়! সমস্যা হবে তাদের, যারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে বলে আসত— “ভোট দিতে যাওয়ার দরকার নেই, আমরা দিয়ে দেবো।” সমস্যা হবে তাদের, যারা বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের বুথে ঢুকতে বাধা দিতে বাইক নিয়ে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে থাকত।
বিজেপি সবসময় বলেছে, ভোট হোক উৎসবের মতো, আতঙ্কের মতো নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর মূলমন্ত্রই হলো প্রত্যেকের অধিকার সুনিশ্চিত করা। আর ভোট দেওয়াটা হলো সেই নাগরিক অধিকারের শ্রেষ্ঠ রূপ। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত আসলে বিজেপির সেই স্বচ্ছ নির্বাচনের লড়াইকেই কয়েক ধাপ এগিয়ে দিল। এবার শুধু নিয়ম-ই নয়, তা কার্যকর করতে মোতায়েন থাকছে হাজার হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান। পুলিশ যদি কোথাও নীরব দর্শক হয়ে থাকে, তবে বাহিনীর জওয়ানরা কিন্তু ছেড়ে কথা বলবে না। যেকোনো সন্দেহভাজন বাইক আরোহীকে থামানোর এবং তল্লাশি করার পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছে তাদের। এর ফলে এলাকা দখল বা ভোটারদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করার পুরোনো ছক আর কাজে আসবে না।
আমরা দেখেছি কীভাবে বিগত পঞ্চায়েত ভোটে রক্ত ঝরেছে বাংলার মাটিতে। বিজেপি কর্মীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে রাজপথ। সেই অরাজকতা রুখতেই আজ এই কড়াকড়ি। যখন বাইকের গর্জন স্তব্ধ হবে, তখনই সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর ব্যালট বক্সে গর্জে উঠবে। আর সেই কণ্ঠস্বর কার পক্ষে যাবে, তা বুঝতে বোধহয় কারোর বাকি নেই! পরিশেষে এটাই বলার— বাংলার মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা চায় শান্তিতে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। যারা মনে করেছিলেন পেশি শক্তি আর বাইক বাহিনী দিয়ে গণতন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখাবেন, সময় এসেছে তাদের শিক্ষা দেওয়ার। নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানানোই এখন কাম্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।