বিশ্বের তাবড় তাবড় শক্তিধর দেশগুলির অর্থনীতি যখন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, মন্দা আর মূল্যবৃদ্ধির চাপে টালমাটাল, ঠিক তখনই ভারত গড়ে তুলেছে এক অবিশ্বাস্য অর্থনৈতিক ঢাল! তথ্যের নিখুঁত বিশ্লেষণ, আধুনিক অ্যালগরিদম আর সময়োপযোগী নীতিনির্ধারণের ওপর ভর করে ভারত আজ বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ঈর্ষণীয় জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে। আর এই অদম্য অগ্রগতির আসল চালিকাশক্তি হলো নিখুঁত সরকারি তথ্য বা ‘ডেটা’। মঙ্গলবার কলকাতায় ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট অর্থাৎ আইএসআই-এর এক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কনক্লেভে যোগ দিতে এসে দেশের এই চোখ ধাঁধানো সাফল্যের নেপথ্য কাহিনী সবিস্তারে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান এস মহেন্দ্র দেব।
এস মহেন্দ্র দেবের স্পষ্ট বার্তা— বর্তমান দুনিয়ায় তথ্যের যে সুবিশাল ভাণ্ডার প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে, সেখানে এক মুহূর্তের জন্য মনোযোগ হারানো বা তথ্যের প্রবাহে সামান্যতম বিচ্ছেদ ঘটার অর্থ হলো এক লহমায় অন্তত ৭ থেকে ৮ মাস পিছিয়ে পড়া। বিশ্ব অর্থনীতির এই দ্রুতগতির যুগে টিকে থাকতে গেলে স্বাদেশিক যে তথ্যের ইমারত ভারত গড়ে তুলেছে, তাকে সার্বক্ষণিক সচল ও কার্যকর রাখতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন কম্পিউটেশন এবং আধুনিক অ্যালগরিদমের নিরলস জাগরণ। দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি, প্রতি মাসের রেকর্ড পরিমাণ জিএসটি সংগ্রহ, নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুদূরপ্রসারী প্রভাব কিংবা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সুদের হার বাড়া-কমার অভিঘাত— এই সমস্ত কিছুই আসলে প্রতিদিনের নিখুঁত ডেটা অ্যানালিসিস এবং নিরন্তর কড়ি মেলানোর চূড়ান্ত ফল। দ্রুত উন্নয়নশীল ভারতের মতো এক বিশাল ভূখণ্ডে এই বৈজ্ঞানিক হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ঢিলেমি দেওয়ার বা কোনো আপস করার জায়গা নেই।
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই এস মহেন্দ্র দেব এক চাঞ্চল্যকর ও গর্বের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান— আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধের মেঘ ও চরম অর্থনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও বিগত তিন বছরে ভারতবর্ষে গড়ে প্রায় ৭.৯ শতাংশ হারে জিডিপি বৃদ্ধির যে ধারাবাহিক পরিসংখ্যান বজায় রয়েছে, তা আজকের বিশ্ব অর্থনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত দুর্লভ ও আক্ষরিক অর্থেই অন্য দেশগুলির কাছে ঈর্ষণীয়। তিনি আরও যোগ করেন, সরকারি পরিসংখ্যানের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা, সেই ডেটা নিখুঁতভাবে যাচাই করা এবং পরবর্তীতে দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য সরকারি নীতি নির্ধারণে তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে এই অ্যালগরিদমের ভূমিকা অপরিসীম। আর এই ব্যবস্থার গুণমান রক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকার কোনো স্তরেই বিন্দুমাত্র আপস করতে নারাজ।
কলকাতার ঐতিহ্যবাহী আইএসআই ক্যাম্পাসে আয়োজিত ‘ইন্ডিয়ান অফিসিয়াল স্ট্যাটিস্টিকস কনক্লেভ অন থিওরেটিক্যাল অ্যান্ড এমপিরিক্যাল ইস্যুজ’ শীর্ষক দুই দিনের এই মেগা কনক্লেভের প্রথম দিনে অধ্যাপক অমর্ত্য কুমার দত্ত সহ উপস্থিত ছিলেন দেশের নামীদামী শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদরা। প্রথম দিনে আধুনিক ডেটা সায়েন্সের ভূমিকা ও জাতীয় নীতিতে তার ব্যবহার নিয়ে বিস্তৃত চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে। আর সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে বিশ্বব্যাঙ্ক সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ আর্থিক কর্তাদের সাথে একযোগে ভারতের ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক রূপরেখা তৈরি নিয়ে মেগা আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আবেগের বশে নয়, বরং কঠিন অঙ্কের ওপর দাঁড়িয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভরসা রেখেই ভারত আজ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি থেকে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দিকে তীব্র গতিতে এগোচ্ছে— কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী মঞ্চ থেকে মোদির অর্থনৈতিক উপদেষ্টার বক্তব্য সেই বলিষ্ঠ বাস্তবতাকেই ফের আন্তর্জাতিক আঙিনায় প্রমাণ করে দিল!