শারদোৎসবের দিনগুলিতে রাজনৈতিক প্রচার ও বই বিক্রির জন্য মণ্ডপের আশেপাশে দলীয় বুকস্টল বসানো বামেদের বহু পুরনো ঐতিহ্য। কিন্তু এবার উত্তর ২৪ পরগনার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বনগাঁয় সিপিএমের সেই বুকস্টল করার পরিকল্পনায় নেমে এলো এক চরম আইনি ধাক্কা! কলকাতা হাইকোর্টের একক বেঞ্চের অনুমতি দেওয়ার নির্দেশকে সরাসরি খারিজ করে স্থগিতাদেশ জারি করল প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ। শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিলেন— “আইনের চোখে সবাই সমান। পুলিশের নির্দিষ্ট ও বৈধ অনুমতি না থাকলে রাস্তার ধারে কোনো রাজনৈতিক দলের টেবিল বা ছাতা পেতেও স্টল খোলার অধিকার নেই; অবিলম্বে এই ধরনের সব বেআইনি স্টল তুলে দিতে হবে!”
ঘটনার সূত্রপাত হয় বনগাঁয় সিপিএমের কার্যালয়ের সামনে পুজো উপলক্ষে বইয়ের স্টল বসানোর আবেদনকে ঘিরে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের তরফে অনুমতি না মেলায় কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল সিপিএম নেতৃত্ব। বৃহস্পতিবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চ শর্তসাপেক্ষে সেই বুকস্টল করার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তড়িঘড়ি প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে আপিল করা হয়। শুক্রবার মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতির কড়া প্রশ্নের মুখে পড়েন আবেদনকারী ও বামেদের আইনজীবীরা।
শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট জানতে চান— “পুলিশের কাছে স্টল বসানোর কোনো লিখিত অনুমতি আছে কি? যদি অনুমতিপত্র না থাকে, তবে পুলিশ পদক্ষেপ করবে না কেন?” সিপিএমের আইনজীবী শামিম আহমেদ দাবি করেন যে তাঁরা পিডব্লিউডি এবং হাইওয়ে অথরিটিকে ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদন পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশের সরাসরি ছাড়পত্র না থাকার বিষয়টি সামনে আসতেই আদালত অত্যন্ত কঠোর মনোভাব গ্রহণ করে। রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য সওয়ালে উল্লেখ করেন— সংশ্লিষ্ট বনগাঁ থানার আইসি এজলাসে উপস্থিত আছেন এবং যেখানে স্টল করার কথা বলা হচ্ছে, সেখান থেকে আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ৬ কিলোমিটার। উৎসবের আবহে ও সীমান্তবর্তী স্পর্শকাতর এলাকায় যেকোনো বিশৃঙ্খলা এড়াতে এই অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।
আইনজীবীদের যুক্তি-পাল্টা যুক্তির মাঝে সিপিএমের পক্ষ থেকে শেষ মুহূর্তের এক মরিয়া আবেদন রাখা হয়। আইনজীবী জানান— পুজো শুরু হয়ে গেছে, আর মাত্র তিন-চারটে দিন বাকি; কোনো মাইক বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা হবে না। এমনকি কোনো পাকা কাঠামো বা ছাউনিরও দরকার নেই, কেবল দলীয় অফিসের সামনে একটি ছাতা ও পাঁচ ফুটের টেবিল পেতে বই বিক্রির অনুমতি দেওয়া হোক। কিন্তু প্রধান বিচারপতি সাফ জানিয়ে দেন— বিধিবদ্ধ নিয়ম সবার জন্য এক। পুলিশের পূর্বানুমতি ছাড়া ছাতা বা টেবিল পেতেও কোনো স্টল চালানো যাবে না।
একই সঙ্গে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছে— রাস্তার ধারে অনুমতিহীন যে সমস্ত স্টল বসেছে, প্রশাসনকে অবিলম্বে সেগুলিও সরাতে হবে। আদালতের এই আদেশের পর প্রশাসন কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করল, তা পরবর্তী শুনানিতে হলফনামা দিয়ে জানাতে বলা হয়েছে। আগামী ২১শে জানুয়ারি এই মামলার পরবর্তী শুনানি ধার্য করেছে ডিভিশন বেঞ্চ।
উৎসবের মুখে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির এই রায় অত্যন্ত পরিষ্কার করে দিল যে, দলীয় পরিচয় বা ঐতিহ্য যা-ই হোক না কেন, প্রশাসনিক নিয়মানুবর্তিতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে আইনের চোখ যে সবার জন্যই সমান!
