পাহাড় থেকে তরাই-ডুয়ার্স, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন থেকে খেলাধুলা!সরকার বদলের পর এবার উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে বড়সড় মাস্টারপ্ল্যান!

দীর্ঘদিনের যানজট, যোগাযোগের সমস্যা, উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব কিংবা পর্যটনের পরিকাঠামো একাধিক সমস্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয় উত্তরবঙ্গের মানুষকে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে যাতায়াত হোক কিংবা চিকিৎসার জন্য দূরদূরান্তে ছুটে যাওয়া, প্রতিদিনের এই ভোগান্তি যেন এখানকার মানুষের জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এবার সেই ছবিটাই বদলানোর লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার।

সরকার বদলের পর রাজ্যে উন্নয়নের যে ছবি তুলে ধরছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, এবার তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু উত্তরবঙ্গ। মঙ্গলবার উত্তরকন্যায় আয়োজিত প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠকে পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের উন্নয়নে একাধিক প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শুধু শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন নয়, উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করাও এই উদ্যোগগুলির অন্যতম লক্ষ্য। বৈঠকের পর দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা প্রকল্পগুলির বিস্তারিত তথ্য সামনে আনেন।

 

পাহাড়ের মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় সমস্যা যানজট। বিশেষ করে পর্যটনের মরসুমে কার্শিয়াং থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথে কার্যত নাভিশ্বাস ওঠে পর্যটক থেকে স্থানীয় বাসিন্দা, সকলেরই। সেই সমস্যা মেটাতে প্রায় ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ রোপওয়ে তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু যাতায়াতের সময়ই কমবে না, পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করারও এক নতুন সুযোগ তৈরি হবে। স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি পর্যটনের ক্ষেত্রেও এই রোপওয়ে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

শুধু যোগাযোগ নয়, চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রেও উত্তরবঙ্গকে স্বনির্ভর করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। কালিম্পংয়ে মেডিক্যাল কলেজ তৈরির কাজ এগোচ্ছে। রাজু বিস্তা জানিয়েছেন, আগামী বছর ৯ ডিসেম্বর মুখ্যমন্ত্রী এই মেডিক্যাল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। পাশাপাশি পাহাড় ও আশপাশের এলাকার হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসার জন্য আর দূরের শহরের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না, স্থানীয় স্তরেই উন্নত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হবে এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।

উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে যোগাযোগ ও পর্যটন ব্যবস্থা। সেই কথা মাথায় রেখেই একাধিক নতুন রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। কার্শিয়াংয়ের ডাউহিল থেকে দিলারাম এবং জামুনে থেকে পুলবাজার পর্যন্ত রাস্তা তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি দার্জিলিংয়ে সার্কুলার রোড চালু করা এবং বিকল্প জাতীয় সড়ক তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ঘুম, লেবং, কালিম্পং, কার্শিয়াং ও মিরিকে নতুন পার্কিংয়ের জায়গা তৈরি এবং দার্জিলিং শহরের বর্তমান পার্কিংয়ের ধারণক্ষমতা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ পর্যটনের মরসুমে যানজট ও পার্কিংয়ের সমস্যায় যে ভোগান্তি তৈরি হয়, তা কমানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।

পর্যটনের মানচিত্রে নতুন করে জায়গা করে নিতে পারে জামুনে। এলাকাটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। হোটেল, পরিবহণ থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসা পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ার আশা রয়েছে। কারণ উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন মানে শুধু বড় রাস্তা বা নতুন ভবন নয়, এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের রোজগার ও ভবিষ্যতের পথও প্রশস্ত করা।

উত্তরবঙ্গের জন্য এই প্রকল্পগুলি নিছক কিছু সরকারি ঘোষণা নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের এক নতুন সম্ভাবনা। পাহাড়ের মানুষ চান উন্নত রাস্তা, সহজ যাতায়াত, হাতের কাছে চিকিৎসা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। তরাই ও ডুয়ার্সের মানুষও চান উন্নয়নের সমান সুযোগ। দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তার বক্তব্য, পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের মানুষের প্রয়োজন এবং প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়েই প্রকল্পগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এখন দেখার, ঘোষণার গণ্ডি পেরিয়ে কত দ্রুত বাস্তবের মাটিতে পৌঁছয় এই উদ্যোগগুলি। কারণ উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে উন্নয়ন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, তা তাঁদের প্রতিদিনের জীবনে স্বস্তি ফেরানোর এক স্বপ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *