বাংলার বাতাসে এখন পরিবর্তনের সুবাস। গত ২৩শে এপ্রিল প্রথম দফার নির্বাচনে বাংলার মানুষ যে অভাবনীয় সাহস দেখিয়েছেন, তার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার দ্বিতীয় দফার প্রস্তুতি তুঙ্গে। ভারতের নির্বাচন কমিশন এবার প্রমাণ করে দিয়েছে যে, গণতন্ত্রের উৎসবে সাধারণ মানুষের একটি ভোটও যেন বৃথা না যায় তার জন্য তারা কতটা মরিয়া। জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে কমিশন এবার যে নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদরে বাংলাকে মুড়ে ফেলেছে, তাতে ঘুম উড়েছে ভোট চোরদের। প্রথম দফার ১৫২টি আসনে প্রায় ৯৩ শতাংশ ভোটদান আর ল কেবল একটা সংখ্যা নয়, শাসক দলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের গর্জন বলে দাবি করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আর এই গর্জন যাতে দ্বিতীয় দফাতেও বজায় থাকে, আর এই আবহেই এক বড়সড় ঘোষণা করলেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
গত শনিবার পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরে একটি সভা ছিল অমিত শাহের। সেখানেই মতুয়াদের নিয়ে এক বড়ো দাবি শোনা গেল তার মুখে। বলে রাখা ভালো, দ্বিতীয় দফায় এই জেলার ১৬টি আসনে ভোট রয়েছে। আর তাই তার আগেই এমন ঘোষণা করলেন শাহ। আসলে মতুয়া ভোট বড়ো বালাই। তাই তো SIR ইস্যুর পরে এই ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে এত ব্যস্ত পদ্ম শিবির। হ্যাঁ, লোকসভায় মতুয়া ভোট বিজেপির দিকে থাকলেও, বিধানসভায় কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও ২১-এর ভোটে এই ১৬টি আসনের একটি নিজের দখলে নিতে পারেনি গেরুয়া শিবির। কারণ এক্ষেত্রে বড়ো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রসঙ্গ। আর এবার সেটিকেই হাতিয়ার করলেন শাহ। অমিত শাহ তার ভাষণে এদিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন, CAA বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন কোনো ভোটা-ভুটির বিষয় নয়, এটি মতুয়াদের অধিকার। বিরোধীরা এতদিন প্রচার করত CAA এলে নাকি নাগরিকত্ব চলে যাবে। কিন্তু শাহের ঘোষণা প্রমাণ করে দিয়েছে যে এটি নাগরিকত্ব কাড়ার জন্য নয়, বরং মতুয়াদের মতো ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হওয়া মানুষদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য। মতুয়াদের নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পাশাপাশি কোনো ভিনদেশি তকমা নয়, বরং ভারতের একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে তারা সমস্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবেন বলেও সাফ জানিয়ে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার কথায়, বিজেপি যা প্রতিশ্রুতি দেয় তা পালন করে। এরপরই তিনি বাংলার বাসিন্দাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, বিজেপির সরকার রাজ্যে নিয়ে এলেই ৫ তারিখের পর মতুয়া সমাজের সকল ভাই-বোনদের নাগরিকত্ব দেবে বিজেপি। উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল অনবরত মতুয়াদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। ঠাকুরনগরের মাটিতে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বলেছেন CAA হতে দেবেন না। আসলে একটি বিশেষ ভোট ব্যাংকের তোষণ করতে গিয়ে তিনি মতুয়াদের নাগরিকত্বের পথে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু অমিত শাহের এই ঘোষণা সেই সব ষড়যন্ত্রকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। শাহ পরিষ্কার বলেছেন, “দিদি, আপনি যতই বাধা দিন, মতুয়াদের নাগরিকত্ব পাওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না।” অর্থাৎ, এই রাজনৈতিক দল নিজেদের কোনো ফায়দার জন্য নয়, বরং হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মতুয়াদের হৃত গৌরব ফিরিয়ে দিতে চায়।
সব মিলিয়ে এটা বলাই যায় যে, অমিত শাহ কেবল নাগরিকত্বের কথা বলেননি, তিনি মতুয়া সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক উন্নতির জন্যও বড় রোডম্যাপ দিয়েছেন। রেল যোগাযোগ থেকে শুরু করে মতুয়া তীর্থক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন—মোদী সরকার প্রতিটি পদক্ষেপে মতুয়াদের সম্মান জানিয়েছে। যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওপার বাংলায় গিয়ে ওড়াকান্দিতে প্রণাম জানান, তখনই বোঝা গিয়েছিল যে মতুয়ারা বিজেপির কাছে কতটা আবেগের। অমিত শাহের এই নতুন ঘোষণা আসলে সেই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কেরই ফসল। এবার থেকে মতুয়াদের সন্তানরা কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে কোনো বাধা ছাড়াই আবেদন করতে পারবেন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, শান্তনু ঠাকুরের নেতৃত্বে এবং অমিত শাহের গ্যারান্টিতে মতুয়া সমাজের প্রতিটি ঘরে আনন্দের প্রদীপ জ্বলে উঠতে চলেছে।