উত্তরবঙ্গের কোচবিহার। নির্বাচনের আগে বিজেপির শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম বড় মঞ্চ। আর সেই মঞ্চ থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। যোগীর অভিযোগ, বিরোধী দলগুলি শুধু মুসলিম ভোটব্যাঙ্কের কথা ভাবে। সংখ্যাগরিষ্ঠদের নিরাপত্তা, নারী সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা এসব নিয়ে তাদের কোনও চিন্তা নেই। তিনি বলেন, তৃণমূল সরকার শুধু মুসলিমদের কথাই ভাবে। বাংলার সাধারণ মানুষ, মহিলাদের নিরাপত্তা, যুবকদের চাকরি এসব তাদের অগ্রাধিকার নয়।
এই বক্তব্যের পরই আরও এক ধাপ এগিয়ে যোগীর হুঙ্কার—বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে উত্তরপ্রদেশের মতোই চলবে ‘বুলডোজার’। অর্থাৎ, অপরাধ, মাফিয়া, অনুপ্রবেশ এই সমস্ত অভিযোগের বিরুদ্ধে বিজেপি কঠোর প্রশাসন চালাবে বলেই বার্তা দিতে চাইলেন তিনি। যোগী বলেন, উত্তরপ্রদেশে বিজেপি সরকার আসার পর যেমন মাফিয়াদের বিরুদ্ধে বুলডোজার চালানো হয়েছে, বাংলাতেও তেমনই হবে। তিনি বলেন, “উত্তরপ্রদেশে আমরা মাফিয়া, সন্ত্রাস আর তুষ্টিকরণের বিরুদ্ধে বুলডোজার চালিয়েছি। বাংলাতেও বিজেপি সরকার এলে একই কাজ হবে।”
শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, যোগী সরাসরি প্রশ্ন তোলেন বাংলার নারী নিরাপত্তা নিয়েও। তার দাবি, রাজ্যে নারীরা নিরাপদ নন। অপরাধ বাড়ছে, কিন্তু সরকার ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতিতে ব্যস্ত। একই সঙ্গে বেকারত্বের প্রসঙ্গ তুলে যোগী বলেন, বাংলার যুবকরা কাজ পাচ্ছেন না। শিল্প আসছে না। অথচ উত্তরপ্রদেশে বিজেপি সরকার নাকি উন্নয়নের মডেল তৈরি করেছে। যোগীর দাবি, ডবল ইঞ্জিন সরকার এলে বাংলাতেও সেই উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্য অন্য। কারণ, বাংলার ভোটে বিজেপি বারবার দুটি বিষয় সামনে আনছে—এক, অনুপ্রবেশ। দুই, মুসলিম তুষ্টিকরণ। এই দুই ইস্যুকে সামনে রেখে তৃণমূলকে ঘিরে একটা রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
যেখানে বিজেপি বলতে চাইছে—তৃণমূল সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের জন্য কাজ করছে, আর বিজেপি “সংখ্যাগরিষ্ঠের নিরাপত্তা”র কথা বলছে। কোচবিহারের সভাতেও সেই একই বার্তা দিলেন যোগী। তিনি দাবি করেন, বাংলায় অনুপ্রবেশকারীদের জন্য রাজনীতি হচ্ছে, আর তার ফলে রাজ্যের চরিত্র বদলে যাচ্ছে। তবে যোগীর এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেছে তৃণমূল। তৃণমূলের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে ইচ্ছে করেই ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা করছে বিজেপি। রাজ্যে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষক সমস্যা বা শিল্প নিয়ে কথা না বলে, বারবার ধর্মের প্রসঙ্গ তুলে ভোট চাইছে বিজেপি। তৃণমূলের বক্তব্য, বাংলার মানুষ বিভাজনের রাজনীতি পছন্দ করেন না। আর বুলডোজার দেখিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করলেও, ভোটে তার কোনও প্রভাব পড়বে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যোগী আদিত্যনাথকে বাংলার প্রচারে আনার কারণও স্পষ্ট। উত্তরপ্রদেশে কঠোর প্রশাসন এবং হিন্দুত্বের মুখ হিসেবে যোগীর একটা আলাদা রাজনৈতিক ইমেজ রয়েছে। বিজেপি সেই ইমেজকে বাংলায় ব্যবহার করতে চাইছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকায়, যেখানে অনুপ্রবেশ এবং পরিচয়ের প্রশ্নকে বড় ইস্যু করে তুলতে চাইছে দল। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—বাংলার ভোটে কি উত্তরপ্রদেশের ‘বুলডোজার মডেল’ কাজ করবে? কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বরাবরই আলাদা। এখানে ধর্মীয় মেরুকরণ যেমন আছে, তেমনই আছে ভাষা, সংস্কৃতি, আঞ্চলিক পরিচয়ের বড় ভূমিকা। ফলে বিজেপির এই আক্রমণ কতটা ভোটে প্রভাব ফেলবে, আর কতটা উল্টে তৃণমূলের পক্ষেই যাবে—সেই উত্তর মিলবে ভোটবাক্সেই। এখন দেখার, বাংলার মানুষ সেই বার্তায় সাড়া দেন, নাকি এই ভাষাকেই প্রত্যাখ্যান করেন।