দেশের অর্থনীতি নাকি তরতর করে এগিয়ে চলেছে, ভারত নাকি বিশ্বমঞ্চে স্বনির্ভর হচ্ছে—মোদি সরকার এবং বিজেপির প্রচারক বাহিনীর দিনরাত এই ঢাকঢোল পিটানোর আড়ালে যে কী পরিমাণ মিথ্যাচার ও তথ্যের ভেল্কিবাজি লুকিয়ে রয়েছে, তা আবারও নগ্ন হয়ে ফুটে উঠল। সম্প্রতি দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-র পেশ করা এক বিস্ফোরক রিপোর্ট নরেন্দ্র মোদির ফাঁপা ‘বিকশিত ভারত’ ও জিডিপি বৃদ্ধির ভিত্তিহীন দাবিকে এক ধাক্কায় ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদি মহা ধুমধাম করে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম তিনমাসে ৭.৮ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির যে লম্বা চওড়া ফাঁকা আওয়াজ ছেড়েছিলেন, অর্থনীতির আসল হিসেব মেলাতেই ফাঁস হয়ে গেছে সেই চরম অসত্য। এসবিআই রিপোর্ট প্রমাণ করে দিচ্ছে, আসল জিডিপি বৃদ্ধি বাস্তবে ২.৬ শতাংশের বেশি নয়! অর্থাৎ নিজের মুখ রক্ষা করতে এবং রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে অন্তত তিন গুণ বাড়িয়ে জিডিপির ভুয়ো তথ্য বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার।
এসবিআই দেশের অর্থনীতির আসল চেহারা উন্মোচন করতে দেশের ১০টি প্রধান শিল্পক্ষেত্রের ময়নাতদন্ত করেছিল। ব্যাঙ্ক, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, বিদ্যুৎ, ধাতু, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, অটোমোবাইল, সিমেন্ট, প্রতিরক্ষা এবং জ্বালানি ক্ষেত্র—যার মধ্যে অন্তত আটটি শীর্ষ সেক্টরের অবস্থা এখন চরম বেহাল। নামজাদা কর্পোরেট সংস্থাগুলি চরম বিপণন সংকটে ভুগছে, মুনাফা বৃদ্ধি তো দূরের কথা, মূলধন রক্ষা করতেই হিমশিম খাচ্ছে তারা। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে জ্বালানি ক্ষেত্রের ব্যবসার অঙ্ক ১.৪ লক্ষ কোটি টাকা থেকে নেমে এক ধাক্কায় প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ মাত্র ৭৬ হাজার কোটিতে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধের কোনো বড় প্রভাব পড়ার আগেই যদি জ্বালানি ক্ষেত্রের মতো জরুরি খাতে এমন ধস নামে, তবে মোদি সরকারের নীতিগত ব্যর্থতাকে কী নাম দেওয়া উচিত?
শুধু তাই নয়, দেশের অন্যতম চালিকাশক্তি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বৃহত্তম তিনটি সংস্থার মুনাফা এক বছরে কমেছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা! ধাতব শিল্পেও বিগত পাঁচ বছরে মুনাফা ১.৩ লক্ষ কোটি থেকে নেমে প্রায় অর্ধেকে থিতু হয়েছে। বিজেপি সরকার ঘটা করে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কিংবা পিএলআই-এর মতো প্রকল্পের ঢাক পিটিয়ে দেশবাসীর পকেটের টাকা খরচ করেছে, অথচ বাস্তব বলছে দেশের উৎপাদন ও শিল্প ব্যবস্থা আজ ধ্বংসের মুখে। আটটি প্রধান ক্ষেত্রে ব্যবসায় চরম মন্দা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বিজেপি সরকারের সমস্ত প্রতিশ্রুতি আসলে স্রেফ এক-একটি বিজ্ঞাপনী বুদবুদ ছাড়া কিছুই নয়।
দেশের শিল্প-বাণিজ্য যখন তলানিতে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন শূন্যের কোঠায়, তখন নিজেদের চরম ব্যর্থতা ঢাকতে প্রধানমন্ত্রী আমজনতাকে ফতোয়া দিচ্ছেন—‘সোনা কিনবেন না, বিদেশে ঘুরতে যাবেন না!’ অথচ নিজের জমানায় কর্পোরেট বন্ধুদের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ মকুব করতে দ্বিধা করেনি এই সরকার। বাস্তব পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলা সত্ত্বেও কথার কারসাজিতে জিডিপির মিথ্যা রূপকথা সাজিয়ে দেশবাসীকে আর কতদিন অন্ধ করে রাখে বিজেপি, এখন সেটাই দেখার।
