এতকাল যাদের ‘খাস ভোটব্যাঙ্ক’ ভেবে তোষণের রাজনীতিতে রেকর্ড গড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, আজ সেই সংখ্যালঘু নেতাদেরই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হলো দলের মূল কমিটি থেকে। হ্যাঁ, তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতির হাইভোল্টেজ বৈঠকের পর যে নতুন কমিটি সামনে এসেছে, তা দেখে কার্যত এমনই দাবি জানিয়েছে রাজনৈতিক মহল। আর সে কারণেই প্রশ্ন উঠছে, তৃণমূলের অন্দরে কি তবে আড়াআড়ি বিভাজন স্পষ্ট? একদিকে ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিপত্য নিয়ে দলের ভেতরেই ক্ষোভের পাহাড়, আর অন্যদিকে আজ সেই বিদ্রোহীদের ডানা ছাঁটতে গিয়ে নতুন কমিটিতে ব্রাত্য রাখা হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমস্ত চেনা মুখকে। কেন জাভেদ খানদের মতো হেভিওয়েট বিধায়কদের ছেঁটে ফেলা হলো? তবে কি তোষণের রাজনীতিই এখন তৃণমূলের গলার কাঁটা?
বিধানসভা ভোটে জেতার জন্য যাদের পায়ে কার্যত তেল দিতে হয়েছিল, ভোট ফুরোতেই নাকি তাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে এখন এটাই সবথেকে বড় গুঞ্জন। এদিন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলের যে জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক হয়েছে, তার ফলাফল একটাই—বিদ্রোহীদের সোজা করে দেওয়া। কিন্তু করতে গিয়ে যা হলো, তাতে দলের ভেতরের কঙ্কালটাই বেরিয়ে পড়েছে। বিজেপি বরাবরই অভিযোগ করে এসেছে, তৃণমূলের রাজনীতি মানেই একতরফা তোষণ। কিন্তু আজ খোদ প্রাক্তন শাসক দলের অন্দরেই তৈরি হয়েছে তীব্র ফাটল। বিশেষ করে যুবরাজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনায়কতন্ত্র মেনে নিতে পারছেন না দলেরই একটা বড় অংশ। সূত্রের খবর, দলের প্রায় ৬০ জন বিধায়ক এখন চরম ‘বেসুরো’। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ৬০ জন বিধায়কের সিংহভাগই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের।
যদিও দলের এই ভাঙনের আশঙ্কাকে ধামাচাপা দিতে এবং বিদ্রোহীদের শিক্ষা দিতেই তড়িঘড়ি এই নতুন কমিটি গড়ার সিদ্ধান্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আর সেই কমিটিতে ঠাঁই হলো না একজনও সংখ্যালঘু তৃণমূল নেতার। জাভেদ খান থেকে শুরু করে অন্য চেনা মুখগুলো আজ ব্রাত্য। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, এটা কি শুধুই বিদ্রোহীদের শাস্তি, নাকি ভোটব্যাঙ্ক হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে নতুন কোনো চাল? বৈঠকের পরে অবশ্য কমিটি নিয়ে মুখ খুলেছিলেন কল্যাণ বন্দোপাধ্যায়। তার কথায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে সহায়তা করার জন্য জাতীয় স্তরে দুজন যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেন। এই দুই নেতা-নেত্রী জাতীয় স্তরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবেন। তাছাড়া, বিভিন্ন রাজ্য থেকে প্রস্তাব ও পরামর্শ নিয়ে সেখানকার কমিটি গঠন করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূলের সভাপতি সুব্রত বক্সী বর্তমানে অসুস্থ। তাই তার স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে তার জায়গায় বসানো হয়েছে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে। তবে ক্ষোভ প্রশমিত করতে সহ-সভাপতি পদে বসানো হয়েছে সাজেদা আহমেদ ও নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু মূল চালিকাশক্তিতে বড় রদবদল। যুব তৃণমূলের রাশ দেওয়া হয়েছে সায়নী ঘোষের হাতে, আর সর্বভারতীয় মহিলা তৃণমূলের সভাপতি করা হয়েছে মালা রায়কে। ছাত্র শাখার দায়িত্ব পেয়েছেন প্রিয়াঙ্কা অধিকারী। দলকে বাঁচানোর জন্য এবং ভাইপো-কে সবরকমের কাঁটা থেকে মুক্ত করতে জাতীয় স্তরে মুখপাত্রের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন স্বয়ং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ডেরেক ও’ব্রায়েন। আর রাজ্যে মিথ্যা ঢাকতে ঢাল করা হয়েছে সেই চেনা মুখ কুণাল ঘোষকে। আর এখানেই উঠছে প্রশ্ন! কমিটি গড়ে, মুখপাত্র বদলে আর চেনা অনুগতদের পদ বিলিয়ে কি দলের ভেতরের এই আদি ও নব্যর লড়াই ধামাচাপা দেওয়া যাবে? যে ৬০ জন বিধায়ক আজ দলের বিরুদ্ধে সুর চড়াচ্ছেন, তাদের ক্ষোভ কি সায়নী ঘোষ বা চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যরা সামলাতে পারবেন? নাকি তোষণের রাজনীতি করতে করতে আজ নিজেদের তৈরি করা ফাঁদেই পা দিয়ে ফেলেছে তৃণমূল কংগ্রেস? উত্তর যদিও সময়ের সাথেই মিলবে।