প্রায় সাড়ে তিন দশক সময়টা কম নয়। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বদলে গিয়েছে কাশ্মীরের অনেক কিছু, বদলে গিয়েছে প্রজন্ম, বদলেছে মানুষের জীবন। কিন্তু কাশ্মীরি পণ্ডিতদের স্মৃতিতে সোপিয়ানের সেই রাম মন্দিরের ক্ষত যেন আজও একই রকম তাজা। যে জায়গায় একদিন প্রার্থনার ধ্বনি উঠত, একসময় সেখানেই নেমে এসেছিল আগুন আর আতঙ্কের অন্ধকার।
১৯৮৭ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর কাশ্মীর উপত্যকায় সশস্ত্র উগ্রবাদী পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সেই অশান্ত সময়ের অভিঘাত থেকে রেহাই পায়নি সোপিয়ানের প্রাচীন রাম মন্দিরও। অভিযোগ, আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল মন্দিরটি। শুধু একটি স্থাপনা ধ্বংস হয়নি, তার সঙ্গে যেন ছিন্ন হয়েছিল একটি সম্প্রদায়ের বহু বছরের স্মৃতি, বিশ্বাস এবং নিজের মাটির সঙ্গে সম্পর্কের একটি অংশ।
তারপর কেটে গিয়েছে একের পর এক বছর। বাস্তুচ্যুত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের অনেকেই উপত্যকা ছেড়ে দূরে চলে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু দূরত্ব কখনও তাঁদের মন থেকে মুছে দিতে পারেনি সোপিয়ানের সেই মন্দিরকে। ইট-পাথরের মন্দির হারিয়ে গেলেও স্মৃতির মন্দিরটি থেকে গিয়েছিল তাঁদের হৃদয়ে। তাই এত বছর পর যখন সেই জমিতে ফের মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হল, তা শুধুমাত্র একটি নতুন ভবন তৈরির ঘটনা হয়ে থাকল না।
শনিবার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং হোম-যজ্ঞে বহু কাশ্মীরি পণ্ডিতের উপস্থিতি সেই আবেগকেই আরও গভীর করে তুলেছে। তাঁদের কাছে এই মুহূর্ত হয়তো ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত একটি হারানো ঠিকানা, একটি হারানো ঐতিহ্য এবং এক টুকরো অতীতকে আবার নিজের চোখের সামনে দেখতে পাওয়ার মুহূর্ত। দীর্ঘ অপেক্ষার পরে যেন মাটির বুকেই লেখা হল, স্মৃতি মুছে যায়নি।এই জমিকে ঘিরে জমি জবরদখলের অভিযোগও রয়েছে। ফলে মন্দির নির্মাণের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ন্যায়বিচার এবং অধিকার ফিরে পাওয়ার অনুভূতিও। তবে এই প্রত্যাবর্তন যেন প্রতিহিংসার প্রতীক না হয়ে শান্তি, সহাবস্থান ও পুনর্গঠনের প্রতীক হয়ে ওঠে এটাই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। কারণ কাশ্মীরের ইতিহাসে ক্ষত অনেক, আর সেই ক্ষত সারাতে প্রয়োজন আরও বেশি মানবিকতা।
জম্মু ও কাশ্মীরের প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহ্য দপ্তরের ‘হেরিটেজ সংরক্ষণ’ প্রকল্পের আওতায় অর্থ অনুমোদনের বিষয়টিও এই উদ্যোগকে আলাদা তাৎপর্য দিয়েছে। কারণ এটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা পুনর্নির্মাণের বিষয় নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিকে সংরক্ষণের সঙ্গেও যুক্ত। একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আবেগও যে সংরক্ষণের দাবি রাখে এই উদ্যোগ যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
সাড়ে তিন দশক আগে যেখানে আগুনের লেলিহান শিখা উঠেছিল, আজ সেখানেই উঠছে নির্মাণের প্রস্তুতি। যেখানে একদিন ভয়ের স্মৃতি জমে ছিল, সেখানেই ফের উচ্চারিত হচ্ছে মন্ত্রোচ্চারণ। সময় হয়তো অতীতকে ফিরিয়ে দিতে পারে না, কিন্তু মানুষ চাইলে ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন করে ভবিষ্যৎ গড়তে পারে। সোপিয়ানের এই রাম মন্দির তাই কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কাছে শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয় এ যেন হারানো শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন প্রতিশ্রুতি।