আলোর উৎসব দীপাবলির পুণ্য আবহে সরকারি মুখপত্রকে কেন্দ্র করে এবার চরম বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ল গুজরাতে! বিশ্ব হিন্দু পরিষদের তীব্র আপত্তি এবং প্রতিবাদের মুখে পড়ে নিজেদের বার্ষিক দীপাবলি প্রকাশনার অনলাইন সংস্করণ থেকে এক মুসলিম কবির কবিতা সরাসরি সরিয়ে দিল গুজরাত রাজ্য সরকার। সনাতন ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত, বিশেষ করে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র এবং ভক্ত সাধ্বী মীরাবাঈকে নিয়ে কুরুচিকর ও আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে কবি আজিজ টাঙ্কারভীর সেই বিতর্কিত কবিতাটি ম্যাগাজিন থেকে বাদ দিয়ে তার জায়গায় কবি প্রকাশ জালালের অন্য একটি কবিতা অন্তর্ভুক্ত করেছে ভূপেন্দ্র প্যাটেল প্রশাসন। সরকারি সাহিত্যের পাতায় এমন ঘটনা সামনে আসতেই শুরু হয়েছে তুমুল রাজনৈতিক ও সামাজিক তরজা।
প্রকৃতপক্ষে প্রতি বছর দীপাবলি উপলক্ষে গুজরাত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার দপ্তরের তরফ থেকে একটি বিশেষ স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়। ‘গুজরাত দীপ উৎসব অঙ্ক’ নামের এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে এবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল সুপরিচিত মুসলিম কবি আজিজ টাঙ্কারভীর একটি কবিতা। কিন্তু পত্রিকাটির ই-সংস্করণ প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মাঠে নামে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা ভিএইচপি। সংগঠনের দাবি— সংশ্লিষ্ট কবিতাটিতে এমন কিছু শব্দ ও বক্তব্য ব্যবহার করা হয়েছে যা ভগবান রাম এবং শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্ত মীরাবাঈয়ের ভাবমূর্তিকে খাটো করে এবং সনাতনীদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে গভীরভাবে আঘাত করে।
বিতর্কের পারদ চড়তেই কালক্ষেপ না করে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেলকে সরাসরি কড়া চিঠি পাঠায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। চিঠিতে স্পষ্ট দাবি জানানো হয়— বিতর্কিত ওই কবিতাটি অবিলম্বে ম্যাগাজিনের অনলাইন ও প্রিন্ট সংস্করণ থেকে মুছে ফেলতে হবে। শুধু কবিতা অপসারণই নয়, যিনি এই ধরনের আপত্তিকর কবিতা রচনা করেছেন সেই কবি আজিজ টাঙ্কারভী এবং রাজ্য সরকারের তথ্য দপ্তরের যে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক কোনো রকম যাচাই না করে এমন লেখাকে সরকারি পত্রিকায় অন্তর্ভুক্তির অনুমোদন দিয়েছেন— তাঁদের দুজনের বিরুদ্ধেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভিএইচপির তরফে অত্যন্ত জোরালো যুক্তি দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়— দীপাবলি হলো ১৪ বছরের দীর্ঘ বনবাস ও রাবণ বধের পর অযোধ্যায় শ্রীরামচন্দ্রের ঐতিহাসিক ও পুণ্য প্রত্যাবর্তনের স্মৃতিবাহী এক মহাপর্ব। সেই উৎসবের সরকারি মুখপত্রে রাম বা মীরাবাঈকে নিয়ে এমন বিভ্রান্তিকর ও অবমাননাকর রচনা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। চিঠি পাওয়ার পরপরই প্রশাসনের শীর্ষস্তরে নড়চড় শুরু হয় এবং কোনো রকম কালক্ষেপ না করে অনলাইন সংস্করণ থেকে আজিজ টাঙ্কারভীর কবিতাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তাঁর জায়গায় স্থান দেওয়া হয় কবি প্রকাশ জালালের ‘জরিয়ে’ শিরোনামের একটি সর্বজনগ্রাহ্য কবিতা।
সরকারের এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন গুজরাত ভিএইচপির শীর্ষ নেতৃত্ব। সংগঠনের রাজ্য মুখপাত্র হিতেন্দ্রসিং রাজপুত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন— “আমাদের আপত্তির পর রাজ্য সরকার অত্যন্ত দ্রুত ও সংবেদনশীল পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্কিত কবিতাটি সরিয়ে দিয়েছে, এর জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।” তবে একই সাথে ভবিষ্যতের জন্য এক কড়া বার্তা দিয়েছে ভিএইচপি। সংগঠনের পক্ষ থেকে রাজ্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হয়েছে— আগামী দিনে সরকারের কোনো প্রকাশনা বা মুখপত্রে শুধুমাত্র সেই সমস্ত সাহিত্যিক ও কবিদেরই স্থান দেওয়া উচিত, যাঁদের এই দেশ, তার ঐতিহ্য, সনাতন ধর্ম এবং সংস্কৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ও ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে।
ধর্মীয় ভাবাবেগ রক্ষা নাকি সাহিত্যের স্বাধীনতা— দীপাবলির আলো ফোটার মুখেই গুজরাতের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়ে গিয়েছে এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় বিতর্ক!