ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশ। আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটানা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর দীর্ঘদিনের রেকর্ড অতিক্রম করতে চলেছেন। স্বাধীনতার পর থেকে নেহরুর এই রেকর্ড ছিল ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। সেই রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়াই মোদির রাজনৈতিক যাত্রার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে
২০১৪ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নরেন্দ্র মোদি। এরপর ২০১৯ এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা তৃতীয়বার দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ধারাবাহিকভাবে জনগণের সমর্থন ধরে রাখা সহজ কাজ নয়। সেই কারণেই তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সাফল্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিস্তর আলোচনা চলছে।
বিজেপির মতে, এই দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার পিছনে রয়েছে মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, উজ্জ্বলা প্রকল্প, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, জনধন যোজনা কিংবা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো উদ্যোগগুলি সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করেছে বলে বিজেপি নেতাদের দাবি।
আবার বিরোধীদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা মানেই সব ক্ষেত্রে সাফল্য নয়। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকদের সমস্যা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাই শুধুমাত্র রেকর্ডের ভিত্তিতে কোনও সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়ন করা উচিত নয় বলেও তারা মনে করে।
তবে একটি বিষয় নিয়ে খুব বেশি দ্বিমত নেই। তা হল, নরেন্দ্র মোদি বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অন্যতম। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর জনপ্রিয়তা এখনও উল্লেখযোগ্য। নির্বাচনী প্রচার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মঞ্চ সব জায়গাতেই তিনি বিজেপির প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
সম্প্রতি বিভিন্ন ডিজিটাল এবং সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক সমীক্ষায়ও মোদির জনপ্রিয়তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁর উপস্থিতি এবং অনুসরণকারীর সংখ্যা বিশ্বের বহু রাষ্ট্রনেতার তুলনায় বেশি। আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও তিনি একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।
নেহরুর সঙ্গে মোদির তুলনা অবশ্য শুধুমাত্র সময়ের নিরিখে। দুজন দুই ভিন্ন যুগের নেতা। নেহরু স্বাধীনতার পর নবগঠিত ভারতের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অন্যদিকে মোদি বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে ভারতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ফলে তাঁদের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং কাজের ক্ষেত্রও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে নেহরুর শাসনব্যবস্থা মূলত প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রনির্ভর পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। নবস্বাধীন দেশের উন্নয়নের দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের কাঁধেই ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গত ১২ বছরের শাসনকালে বারবার উঠে এসেছে ‘জন ভাগীদারি’ বা জনগণের অংশগ্রহণের ধারণা। স্বচ্ছ ভারত অভিযান, ডিজিটাল পেমেন্ট, জল সংরক্ষণ, টিকাকরণ কর্মসূচি-সহ একাধিক প্রকল্পকে জনআন্দোলনের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে কেন্দ্র সরকার। এর কেন্দ্রে ছিল সবকা প্রয়াস অর্থাৎ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ভাবনা।
নরেন্দ্র মোদির এই নতুন রেকর্ড ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে স্থান পেতে চলেছে। সমর্থকদের কাছে এটি গর্বের মুহূর্ত, আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এটি দীর্ঘমেয়াদি জনসমর্থন ও নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আগামী দিনে এই রেকর্ড আরও কতদূর গড়ায়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে দেশের রাজনৈতিক মহলের।